বাংলাদেশ নারী জাতীয় ফুটবল দল বর্তমানে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক গল্পগুলোর একটি। দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে এখন বাংলাদেশের নারী ফুটবল বিশ্ব ফুটবলের কাছেও একটি অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠছে।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়, এশিয়ার মঞ্চে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্স এবং তৃণমূল থেকে উঠে আসা মেয়েদের সংগ্রামের গল্প বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। দেশের পতাকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরছে এই নারী ফুটবল দল।
কিন্তু মাঠের এই সাফল্যের আড়ালে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বাফুফের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। বিশেষ করে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সাইফুল বারী টিটুকে ঘিরে নতুন করে নানা প্রশ্ন উঠছে ফুটবলাঙ্গনে। একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, নারী জাতীয় দলের প্রধান কোচ পিটার বাটলারের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে ভেতর থেকেই।
সম্প্রতি নারী জাতীয় দলের কোচিং স্টাফে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। দীর্ঘদিনের সহকারী কোচ মাহবুবুর রহমান লিটু ও অনন্যাকে মূল জাতীয় দল থেকে সরিয়ে বয়সভিত্তিক দলে পাঠানো হয়েছে। প্রথমদিকে এটি নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হলেও সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সিদ্ধান্ত মূলত পিটার বাটলারের কাজকে আরও স্বচ্ছ, স্বাধীন ও পেশাদার করার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে।

বিশেষ করে নতুন সহকারী হিসেবে অভিজ্ঞ কোচ আবুল হোসেনকে যুক্ত করাকে পিটার বাটলারের পছন্দের সিদ্ধান্ত বলেই জানা গেছে। প্রায় দেড় যুগের কোচিং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন আবুল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে বাফুফের এলিট একাডেমি, বয়সভিত্তিক দল এবং স্কাউটিং কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিভাবান ফুটবলার খুঁজে বের করে জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনার ক্ষেত্রে তার অবদান রয়েছে। ফুটবল সংশ্লিষ্টদের মতে, আবুল হোসেন মাঠের কাজ বোঝেন, অপ্রয়োজনীয় রাজনীতি নয়। ফলে পিটার বাটলারের সঙ্গে তার সমন্বয় নারী দলের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
অন্যদিকে, সাবেক নারী দলের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনকে আবারও নারী অনূর্ধ্ব-১৭ দলে ফেরানোর আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি কোচিং সিদ্ধান্ত নয়; বরং নারী ফুটবলে পুরোনো প্রভাববলয়কে পুনরায় সক্রিয় করার একটি অংশও হতে পারে।
যদিও নারী ফুটবলের সাফল্যের সঙ্গে ছোটনের নাম জড়িয়ে আছে, তবে নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী নারী ফুটবলের কাঠামোগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের পরিকল্পনার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল সাবেক বাফুফে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলির। নারী ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, খেলোয়াড় উন্নয়ন কাঠামো, গ্রাসরুট প্রোগ্রাম, ট্রেনিং মডিউল এবং ট্যালেন্ট আইডেন্টিফিকেশন—সবকিছুই মূলত পল স্মলির তৈরি ছক অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছিল।
সেই কাঠামোর বাস্তবায়নের অংশ ছিলেন ছোটন। ফলে নারী ফুটবলের সাফল্যকে শুধুমাত্র একজন কোচের ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে দেখাটা পুরো বাস্তবতা তুলে ধরে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফুটবলাঙ্গনের একটি বড় অংশ মনে করছে, পিটার বাটলার যদি দীর্ঘমেয়াদে সফল হন, তাহলে নারী ফুটবলে কিছু ব্যক্তির দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব কমে যেতে পারে। বিশেষ করে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সাইফুল বারী টিটুর ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই বর্তমান নানা ধরনের অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শুধু নারী ফুটবল নয়, পুরুষ জাতীয় দলের কোচ নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও টিটুর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। ফুটবল সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আধুনিক ফুটবল দর্শনের বদলে ব্যক্তি নির্ভর সিদ্ধান্ত এবং অভ্যন্তরীণ সমীকরণই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে পুরুষ ফুটবলও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি থেকে পিছিয়ে রয়েছে।
বিশ্ব ফুটবলে একজন টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের মূল দায়িত্ব হলো—
কিন্তু সমালোচকদের দাবি, টিটুর সময়কালে এসব মৌলিক দায়িত্বের অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। বরং দেশের ফুটবল এখনো ব্যক্তি নির্ভরতা, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং সমন্বয়হীনতার সমস্যায় ভুগছে। বিশেষ করে গ্রাসরুট ফুটবল ও খেলোয়াড় উন্নয়ন কাঠামো আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারেনি বলেই মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।
লোকমুখে আরও শোনা যায়, বাংলাদেশের ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত তথাকথিত “সিন্ডিকেট সংস্কৃতি”-র মধ্যে টিটু-মিন্টু বলয় অন্যতম প্রভাবশালী অংশ। যদিও এসব অভিযোগের আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি, তবে ফুটবলাঙ্গনে এ নিয়ে আলোচনা নতুন নয়।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশ নারী ফুটবলের এই স্বর্ণসময় কি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে? কারণ এই নারী দল শুধু ট্রফি জিতছে না, তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য নতুন পরিচয় তৈরি করছে। তাই সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি নয়, বরং পেশাদার পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনাই এখন সময়ের দাবি।
এসআর