[email protected] সোমবার, ৪ মে ২০২৬
২১ বৈশাখ ১৪৩৩

আসবে কি দেশের ফুটবলের সঠিক পথ?

তরুণদের দাপটে বিশ্ব ফুটবল, ‘সিন্ডিকেটের ভারে’ পিছিয়ে বাংলাদেশ

মোঃ আলী আকবর রনী

প্রকাশিত: ৪ মে ২০২৬ ৩:২০ পিএম

বিশ্ব ফুটবলে তরুণদের দাপট যখন নতুন যুগ গড়ছে, তখন বাংলাদেশ ফুটবল আটকে আছে পুরনো কাঠামো ও ‘সিন্ডিকেট’ বিতর্কে—যেখানে বঞ্চিত হচ্ছে সম্ভাবনাময় তরুণরা।

বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সময়টা এখন আর শুধুই অভিজ্ঞদের নয়—এটি এখন তরুণদের যুগ। ইউরোপের শীর্ষ লিগ থেকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা—সবখানেই ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী ফুটবলাররা নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে। লামিনে ইয়ামাল-এর মতো কিশোর প্রতিভা যেখানে বিশ্বের সেরা ডিফেন্স ভেঙে দিচ্ছে, জামাল মুসিয়ালা কিংবা গাভি মধ্যমাঠে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করছে, সেখানে আর্দা গুলের বা এস্তেভাও উইলিয়ান ভবিষ্যতের সুপারস্টার হিসেবে ইতোমধ্যেই স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে। একই ধারায় উঠে আসছে পাউ কুবারসি এবং ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুয়োনো-এর মতো তরুণরাও।

এই প্রজন্মের ফুটবলাররা শুধু প্রতিভাবান নয়—তারা অত্যন্ত ফিট, দ্রুতগামী, ট্যাকটিক্যালি পরিপক্ক এবং মানসিকভাবে দৃঢ়। আধুনিক ফুটবলের যে গতি, প্রেসিং, ট্রানজিশন ও ডায়নামিক প্লে—সবকিছুর সঙ্গে তারা সহজেই খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। ফলে বিশ্ব ফুটবল এখন একটি নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে, যেখানে বয়স আর বাধা নয়, বরং তরুণরাই নেতৃত্ব দিচ্ছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের স্রোতের বাইরে যেন দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ফুটবলের বাস্তবতা ভিন্ন এক গল্প বলে—যেখানে প্রতিভা থাকলেও তা জাতীয় দলে প্রতিফলিত হয় না, যেখানে বয়সভিত্তিক সাফল্য থাকা সত্ত্বেও সিনিয়র পর্যায়ে এসে সবকিছু যেন থমকে যায়। দেশের ফুটবল অঙ্গনে বহুদিন ধরেই একটি অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে—“সিন্ডিকেট”। শব্দটি শুনতে অস্বস্তিকর হলেও অনেকের মতে, এটি এখন কঠিন বাস্তবতা। অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় দলের স্কোয়াড নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ নয়; বরং একটি অদৃশ্য প্রভাব বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ সেখানে কাজ করে।

বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক দলগুলো বরাবরই আশার আলো জ্বালিয়েছে। অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৭ কিংবা অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে দেশের তরুণ ফুটবলাররা বারবার সম্ভাবনার জানান দিয়েছে। দেশের ফুটবলের যেসব অর্জন, তার বড় অংশই এসেছে এই বয়সভিত্তিক দলগুলোর হাত ধরে। এখানেই তৈরি হয় ভবিষ্যতের ভিত্তি, এখানেই জন্ম নেয় নতুন স্বপ্ন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—জাতীয় দলে উঠলেই কেন সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়?

 

 

ফুটবল সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি অদৃশ্য বাধা কাজ করে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ক্লাব বা গোষ্ঠীর প্রভাবের কারণে স্কোয়াড প্রায়ই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে নতুন প্রতিভারা জায়গা পায় না, আর একই মুখ বছরের পর বছর জাতীয় দলের অংশ হয়ে থাকে।

দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দলে খেলে যাচ্ছেন সোহেল রানা, তপু বর্মন, সাদ উদ্দিন, সুজন হোসেন, বিশ্বনাথ ঘোষ, সুমন রেজাদের মতো খেলোয়াড়রা। তারা অভিজ্ঞ—এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, তাদের দীর্ঘ উপস্থিতি কি দেশের ফুটবলে দৃশ্যমান কোনো আন্তর্জাতিক সাফল্য এনে দিয়েছে? দল ভালো খেলুক বা খারাপ—তাদের অবস্থান যেন অপরিবর্তিত থাকে। ফলে জাতীয় দল অনেকটা “স্থায়ী স্কোয়াড”-এ পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ফুটবল বোদ্ধাদের একটি অংশ এখনও মনে করেন, এই খেলোয়াড়দের বিকল্প নেই। বিশেষ করে মাঝমাঠে সোহেল রানাকে “অপরিহার্য” বলা হয়। কিন্তু পাল্টা প্রশ্নও উঠছে—যদি বিকল্প তৈরিই না করা হয়, তাহলে বিকল্প আসবে কোথা থেকে? আধুনিক ফুটবলে স্কোয়াড ডেপথ ও রোটেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা বাংলাদেশে এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

 

বিশ্ব ফুটবলের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সই একজন খেলোয়াড়ের সেরা সময়। এই বয়সে তার গতি, ফিটনেস, রিফ্লেক্স এবং শেখার ক্ষমতা সর্বোচ্চ থাকে। ইউরোপের অনেক দেশই ২৫ বছরের বেশি বয়সী খেলোয়াড়দের ধীরে ধীরে নতুনদের জায়গা করে দিতে শুরু করে। কিন্তু বাংলাদেশে বাস্তবতা উল্টো—এখানে “অভিজ্ঞতা” শব্দটি অনেক সময় পারফরম্যান্সের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তরুণদের জায়গা তৈরি হয় না, বরং তারা সুযোগ হারিয়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

বর্তমান সময়ে একটি নতুন সম্ভাবনার দিক খুলেছে—বিদেশে খেলা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তি। ইউরোপ বা অন্যান্য উন্নত লিগে খেলা এই খেলোয়াড়রা দেশের ফুটবলে নতুন গতি ও মানসিকতা আনতে পারে। কিন্তু মাঠে তাদের পারফরম্যান্স অনেক সময়ই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না, যার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে দলীয় সমন্বয়ের অভাব। সাম্প্রতিক সিঙ্গাপুর ম্যাচে হামজা ও সোমিতদের হতাশা, তাদের শরীরী ভাষা—সবকিছুই যেন সেই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে কোচদের স্বাধীনতা নিয়ে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে একজন কোচ তার নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী দল গঠন করেন। কিন্তু বাংলাদেশে অভিযোগ রয়েছে, কোচদের অনেক সময় পূর্বনির্ধারিত স্কোয়াড নিয়ে কাজ করতে হয়। এতে তাদের কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। সাবেক কোচ জাভিয়ার কেবরেরা Javier Cabrera-এর সময় এই বিতর্ক আরও সামনে আসে। অধিনায়ক নির্বাচন, মাঠে উপস্থিতি এবং ট্যাকটিক্যাল সিদ্ধান্ত—সবকিছুতেই অসামঞ্জস্যের অভিযোগ ওঠে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একেবারেই অস্বাভাবিক।

প্রতিভা মূল্যায়ন নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন। ‘আরহাম ইসলাম’-এর উদাহরণ এখন আলোচনায়। দেশের কিছু কোচ যেখানে তাকে অযোগ্য মনে করেছেন, সেখানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার অনূর্ধ্ব-২০ দলে জায়গা করে নিয়েছেন। এতে প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি নিজের প্রতিভা চিনতে ব্যর্থ হচ্ছে?

এই পুরো চিত্রের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল—যারা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মডেলে এগিয়েছে। ইংলিশ কোচ Peter Butler-এর অধীনে দলটি শৃঙ্খলা, ফিটনেস এবং তরুণদের উপর আস্থা রেখে এগিয়েছে। ফলাফল—আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দৃশ্যমান সাফল্য এবং এশিয়ান লেভেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সক্ষমতা। এখানে “সিন্ডিকেট” নয়, বরং পারফরম্যান্সই মূল মানদণ্ড।

বাংলাদেশ পুরুষ ফুটবলের বর্তমান অবস্থা অনেকের কাছে “স্থবিরতা”-র প্রতীক হয়ে উঠেছে। এমনকি সমর্থকদের মুখে মুখে “সিন্ডিকেট” শব্দটি এখন বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মাঠের পারফরম্যান্সেও এর প্রভাব দৃশ্যমান বলে মনে করছেন অনেকেই।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে বিশ্ব ফুটবলের তরুণ বিপ্লব, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা। এই পরিস্থিতিতে যদি স্বচ্ছতা, পারফরম্যান্সভিত্তিক নির্বাচন এবং কোচদের স্বাধীনতা নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে উন্নতির পথ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

প্রশ্ন এখন একটাই—বাংলাদেশ কি নারী দলের সফল মডেল অনুসরণ করে নতুন করে নিজেদের গড়ে তুলবে, নাকি পুরনো কাঠামোর ভেতরেই আটকে থাকবে? এখন সময়ই দেবে সেই উত্তর।

এসআর

সম্পর্কিত খবর