দীর্ঘসূত্রতায় বিরক্ত মিকেল, নতুন কোচ নিয়োগে আবারও প্রশ্নের মুখে বাফুফে।
বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের নতুন প্রধান কোচ নিয়োগকে ঘিরে আবারও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা ও আলোচনা।
কয়েকদিন ধরেই দেশের ফুটবল অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত নাম ছিল ব্রাজিলিয়ান কোচ রোজারিও মিকেল।
অলিম্পিক পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকা এই কোচকে বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)।
তবে এখন জানা যাচ্ছে, দীর্ঘসূত্রতা ও সিদ্ধান্তহীনতায় বিরক্ত হয়ে তিনি আর বাংলাদেশের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন।
যদিও বাফুফের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি, তবু সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় মিকেল নিজেকে এই প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে নিয়েছেন।
বিষয়টি ফুটবল অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, আদৌ কি বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানের কোচদের সঙ্গে পেশাদার আচরণ করতে পারছে?
গত ৪ মে জাতীয় দলের কোচ নিয়োগ নিয়ে অনুষ্ঠিত সভার পর বাফুফের মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম বাবু জানিয়েছিলেন, তিন দিনের মধ্যেই নতুন কোচের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নাম ঘোষণা করা হয়নি।
এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কোচ নিয়োগের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিলেন কয়েকজন বিদেশি কোচ।
তাদের মধ্যে আলোচনায় সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন ব্রাজিলিয়ান রোজারিও মিকেল ও ওয়েলসের সাবেক কোচ ক্রিস কোলম্যান।
জানা গেছে, মিকেল মাসিক প্রায় ৩০ হাজার মার্কিন ডলার পারিশ্রমিক দাবি করেছিলেন। অন্যদিকে ক্রিস কোলম্যানের দাবি ছিল প্রায় ২৫ থেকে ২৬ হাজার ডলার।
বাংলাদেশ ফুটবলের বর্তমান বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোচদের আগ্রহ তৈরি হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছিলেন অনেকে।
বিশেষ করে হামজা চৌধুরীর মতো প্রবাসী ফুটবলারদের যুক্ত হওয়া, জাতীয় দলের সাম্প্রতিক আলোচনায় আসা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কারণে এবার তুলনামূলক বড় মাপের কোচ আনার চেষ্টা হচ্ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াতেই এখন দেখা দিয়েছে জটিলতা।
ফুটবল সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন, বাফুফের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয়ের অভাব এবং বিভিন্ন মহলের প্রভাবের কারণেই কোচ নিয়োগে বিলম্ব হচ্ছে।
অতীতেও জাতীয় দলের কোচ নিয়োগ কিংবা চুক্তি নবায়নে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ উঠেছিল। জাভিয়ের ক্যাবরেরার চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রেও সময়ক্ষেপণের সমালোচনা হয়েছিল।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন— এই অনিশ্চয়তা চলতে থাকলে ক্রিস কোলম্যানের মতো হাই-প্রোফাইল কোচকেও কি হারাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ? ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে ওয়েলসকে ঐতিহাসিক সেমিফাইনালে তোলা এই কোচকে ঘিরে দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াই ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য— সামাজিক মাধ্যমে “নেইমারের বাবার সুপারিশে” রোজারিও মিকেলের নাম এসেছে বলে আলোচনা থাকলেও, এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য বা আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তাই সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে এই তথ্যকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, তিনি বাফুফের কোচ নির্বাচনের আলোচনায় থাকা একজন প্রার্থী ছিলেন এবং তার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে তবে ব্যক্তিগত সুপারিশের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক ফুটবলে শুধু বড় নামের কোচ আনাই যথেষ্ট নয়; বরং দ্রুত সিদ্ধান্ত, পরিষ্কার পরিকল্পনা এবং পেশাদার যোগাযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক মানের কোচদের সঙ্গে আলোচনায় বিলম্ব বা অনিশ্চয়তা তৈরি হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ হারাতে পারেন আরও অনেক কোচ।
বর্তমানে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল জানিয়েছেন, খুব দ্রুতই নতুন কোচের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসবে।
তবে সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে প্রশ্ন— বাংলাদেশের ফুটবল কি এখনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় প্রস্তুত হতে পারেনি?
এখন দেখার বিষয়, বাফুফে শেষ পর্যন্ত দ্রুত ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারে কিনা। নাকি আবারও দীর্ঘসূত্রতা, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও অদৃশ্য প্রভাবের কাছে হার মানবে বাংলাদেশের ফুটবল?
এসআর