ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি।
ক্যাম্পাসজুড়ে নীরবতা, ফাঁকা করিডোর আর পাখির ডাক—এই সময়টাতেই শুরু হয় একদল মানুষের নিরলস কর্মযজ্ঞ।
কেউ ঝাড়ু দিচ্ছেন, কেউ নালা-নর্দমা পরিষ্কার করছেন, আবার কেউ দায়িত্ব নিচ্ছেন নিরাপত্তার। আলোচনার বাইরে থাকা এই মানুষগুলোর হাতেই প্রতিদিন সচল থাকে Bangladesh University of Textiles (বুটেক্স)।
শিক্ষার্থীদের ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা সহশিক্ষা কার্যক্রমের পেছনে রয়েছে এই অদেখা শ্রম। পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা প্রতিদিন ক্যাম্পাসকে বাসযোগ্য রাখেন, অথচ তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি ও পারিশ্রমিক অনেক ক্ষেত্রেই তাদের পরিশ্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নিরাপত্তাকর্মীদের জীবনও কম চ্যালেঞ্জিং নয়। দিন-রাত পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের। বিশেষ করে রাতের নিরবতায় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের ওপরই নির্ভর করে।
দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত অফিস সহায়ক ও নিরাপত্তা প্রহরী নিতাই দত্ত জানান, প্রায় তিন দশক ধরে তিনি এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হোক কিংবা ছুটি—সব পরিস্থিতিতেই দায়িত্ব পালন করতে হয়।
নিয়মিত বেতনে সংসার কোনোভাবে চললেও অতিরিক্ত কাজের বিনিময়ে যে পারিশ্রমিক পাওয়া যায়, তা বর্তমান বাস্তবতার তুলনায় খুবই কম। তবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা আন্তরিক সম্পর্ক তার কাজের বড় প্রাপ্তি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ক্যাম্পাস জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হলের সাপোর্ট স্টাফরা। শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে তারা নানাভাবে সহায়তা করে থাকেন—খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পরিষেবা দেওয়া পর্যন্ত। কিন্তু তারাও প্রত্যাশা করেন ন্যায্য মজুরি ও উন্নত কর্মপরিবেশ।
Syed Nazrul Islam Hall-এর পরিচ্ছন্নতা কর্মী মো. হুমায়ুন কবির জানান, অনেকেই দীর্ঘ ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে কাজ করলেও তাদের বেতন এখনো খুবই সীমিত। এতে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি হল কর্তৃপক্ষের কাছে এই বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি অতিরিক্ত কাজের যথাযথ পারিশ্রমিক না পাওয়ার কথাও তুলে ধরেন। তবে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা ও আন্তরিকতা তাদের কাজের কষ্ট অনেকটাই কমিয়ে দেয় বলেও তিনি বলেন।
অন্যদিকে GMAG Osmani Hall-এর নিরাপত্তা প্রহরী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সীমিত আয়ে পরিবার পরিচালনা করা কঠিন। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়ায় তারা উৎসবভাতা থেকেও বঞ্চিত হন। তবুও দায়িত্ববোধ আর শিক্ষার্থীদের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রতি বছর International Workers' Day এলে শ্রমের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তবে বুটেক্সের এই নীরব কর্মীদের জন্য শুধু প্রতীকী স্বীকৃতি নয়, প্রয়োজন বাস্তব পরিবর্তন—ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং জীবনের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
কারণ শেষ পর্যন্ত, এই অদৃশ্য শ্রমিকদের হাতেই নির্ভর করে ক্যাম্পাস জীবনের প্রতিদিনের ছন্দ ও গতিশীলতা।
এসআর