★ পরিচালক, উপ পরিচালকসহ একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ, ট্যুর বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ
পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
যার দায়িত্ব এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অনিয়ম ধরা।
তবে, সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানটি নিজেই ঘুষ-দুর্নীতি এবং নানা অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
ডিআইএর একাধিক শিক্ষা পরিদর্শক ও সহকারী শিক্ষা পরিদর্শকের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে গিয়ে নিরীক্ষার নামে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। এমনও জনশ্রুতি রয়েছে যে, ডিআইএ-তে চাকরি করা শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য দ্রুত অর্থ অর্জনের একটি ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিগত আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর ডিআইএ নিয়ে ঘুষ, দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ ছিল। সেই ধারাবাহিকতা এখনও চলমান। তবে সবাই আশা করেছিল বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর এই প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিমুক্ত করে স্বচ্ছ ও ক্লিন ইমেজের কর্মর্কতা দিয়ে ডিআইএ-এর বদনাম মুক্ত করবেন।
কিন্তু পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক প্রফেসর এম এম সহিদুল ইসলাম লিটুর নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয়। বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেন।
শিক্ষামন্ত্রী আ.ন.ম এহসানুল হক মিলন বলেন, আমার কাছে সবচেয়ে বেশি তদবির আসে ডিআইএতে বদলী হয়ে আসার জন্য। কোন কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের সত্যতার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে হুশিয়ারি দেন।
ডিআইএতে বদলি, ট্যুর অনুমোদন, তদন্ত কার্যক্রম ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এই চক্রের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
কেবল তাই নয় টাকার বিনিময়ে পতিত সরকারের লোকজনকে প্রমোট করারও গুঞ্জনও রয়েছে পরিচালকের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই পরিচালক তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। এই চক্রে ঢাকা বিভাগের সাবেক উপপরিচালক মো. ওয়াজ কুরনী, উপ-পরিচালক প্রফেসর মোহাম্মদ আলফাজ উদ্দীন, উপ-পরিচালক প্রফেসর সাহানুল কবির, শিক্ষা পরিদর্শক এ.কে.এম রাশিদুল হাসান, সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খানের ভাগিনা পরিচয় দানকারী সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক এফ.এম. শাহাবুদ্দীন রুমন, অডিট অফিসার চন্দন কুমার দেব সহ আরও কয়েকজন জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বদলির ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগ পেতেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি নতুন পদায়নের ক্ষেত্রেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ রয়েছে, ট্যুর অনুমোদনকে কেন্দ্র করে একটি বড় ধরনের বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ট্যুরে যাওয়ার আগে ও পরে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে মো. ওয়াজ কুরনী ও প্রফেসর মোহাম্মদ আলফাজ উদ্দীনের বিরুদ্ধে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
মো. ওয়াজ কুরনীর বিরুদ্ধে ঘুষ ছাড়া ফাইল নিষ্পত্তি না করা, ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। টাঙ্গাইলে একটি কলেজ পরিদর্শনকালে সহকারী পরিদর্শকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া, একটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে তদন্ত টিমের অগোচরে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠে আসে।
অন্যদিকে, মোহাম্মদ আলফাজ উদ্দীনের বিরুদ্ধে ট্যুরে অংশগ্রহণের জন্য আগাম অর্থ নেওয়া, কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে নারী সহকর্মীকে যৌন হয়রানির অভিযোগও করা হয়েছে।
উপপরিচালক শাহানুল কবিরের বিরুদ্ধে কমলাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে পরিদর্শনের সময় ৫ লাখ টাকা গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ওই অর্থ অডিট অফিসার চন্দন দেবের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হলেও তদন্ত দলের অন্য সদস্যদের তা দেওয়া হয়নি, ফলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
এছাড়া, অডিট অফিসার চন্দন দেবের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়া এবং প্রভাব খাটিয়ে ১০ বছর একই কর্মস্থলে থাকার অভিযোগ উঠেছে।
তিনি পুরো আওয়ামী আমলে সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খানের ভাগিনা পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে ডিআইএ আসেন।
আওয়ামীপন্থী সব কর্মকর্তা ৫ আগষ্টের পর বদলী হলেও অজ্ঞাত কারণে তাকে বদলি করা যায়নি।
৫ আগষ্টের পর ভোল পাল্টিয়ে বিএনপি সাজার অপচেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
শাহবুদ্দিন রুমনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। তাকে পরিচালকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সহকারী পরিদর্শক ফজিলাতুন্নেছা মিতুর বিরুদ্ধে অনিয়মিত উপস্থিতি, প্রভাব খাটিয়ে পদায়ন নেওয়া এবং পরিদর্শনের নামে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে পরিদর্শক নুসরাত হাছনীন-এর বিরুদ্ধেও নিয়মিত অর্থ আদায় এবং পরিবারের সদস্যকে সম্পৃক্ত করে লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
প্রভাব ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ-পরিচালক প্রফেসর মো. সহিদুল ইসলাম লিটুর বিরুদ্ধে।
রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে পদায়ন নেওয়া, আবাসন ব্যবসায় সম্পৃক্ততা এবং বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও রাশেদুল হাসান মানিক বদলি তদবির ও ট্যুর বাণিজ্যে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন এবং বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন বলে অভিযোগ উঠে
এতসব গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে ডিআইএ-র চলমান কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ডিআইএ পরিচালক প্রফেসর এম এম সহিদুল ইসলাম লিটু বলেন, আমি কোন অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত নই। আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে। আমার কোন সিন্ডিকেট নেই। গত চার মাস যাবত কোন ট্যুর নেই। পূর্বের ট্যুরগুলোর রিপোর্ট তৈরী করছি।
আওয়ামী লীগের কর্মকর্তাদের প্রমোট করার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, যা শুনছেন তা সব অপপ্রচার।
সূত্র - সংবাদ প্রতিদিন।
এসআর