আগাম ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে ভয়াবহ বোরো বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা হিসেবে পরিচিত এ অঞ্চলে এবার হাজারো কৃষক ফসলহানির মুখে পড়ে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন।
কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, জেলার প্রায় ৮০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকায়।
ধান কাটার মৌসুমে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার একের পর এক হাওর প্লাবিত হয়ে পড়ে। ফলে পাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়।
কয়েকদিন আগেও যেসব মাঠে সোনালি ধানের সমারোহ ছিল, এখন সেখানে শুধু পানি আর পানি দেখা যাচ্ছে।
অনেক কৃষক শেষ চেষ্টা হিসেবে বুকসমান পানিতে নেমে কিংবা ডুব দিয়ে ধান কাটছেন। কেউ নৌকায় করে ধান তুলছেন, আবার কেউ ভেজা ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন।
তবে এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ ধান পানিতে নষ্ট হতে শুরু করেছে। অন্যদিকে বাজারে ধানের দাম কম থাকায় যে ধান রক্ষা করা গেছে, সেটিও বিক্রি করে আশানুরূপ মূল্য পাচ্ছেন না কৃষকরা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১০টি উপজেলায় প্রায় ১৬ হাজার ৭৭৮ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিবৃষ্টিতে প্রায় ১৮ হাজার ৪৭৮ হেক্টর জমি পানির নিচে চলে যায়।
এতে প্রায় ৭৫ হাজার ৯৪৯ টন ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৭২ কোটি টাকার বেশি।
শুধু হাওরাঞ্চলেই চলতি মৌসুমে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল।
এর মধ্যে ১১ হাজার ২৩০ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। এতে প্রায় ৪৮ হাজার টনের বেশি ধান উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভ ও হতাশা থেকে কৃষকরা বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন। ‘হাওরের কৃষকের কান্না থামবে কবে’ এমন স্লোগানে আয়োজিত কর্মসূচি থেকে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়।
দাবির মধ্যে রয়েছে বীজ সংক্রান্ত অনিয়মের তদন্ত, কৃষিঋণ মওকুফ, হাওরের ইজারা প্রথা বাতিল, ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ ও পশুখাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, শ্রমিক সংকট, ধানের কম দাম এবং দুর্যোগ—সব মিলিয়ে তারা বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন। দ্রুত সরকারি সহায়তা ও বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে এবং সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ টন।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা নির্ভুলভাবে প্রস্তুতের জন্য যাচাই-বাছাই চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে তিনি জানান।
এসআর