[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
২১ কার্তিক ১৪৩৩

ঢাকা ওয়াসার পদ্মা প্রকল্পে ১৫৬২ কোটি টাকার দুর্নীতি: নেপথ্যে রেহানা-তাকসিম

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৫ নভেম্বর ২০২৬ ৬:৩৮ পিএম

সংগৃহীত ছবি

ঢাকা ওয়াসা ও চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরস্পরবিরোধী স্বার্থের কারণে চরম অনিয়মের

 শিকার হয়েছে পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্প। নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার, প্রয়োজনীয় সরবরাহ লাইন নির্মাণ না করা এবং দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার পানি নিশ্চিত না করেই ঠিকাদারকে জামানতসহ চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে ওয়াসা ও সরকারের মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা, ওয়াসার সাবেক এমডি তাকসিম এ খান, প্রকল্প পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম এবং চীনা ঠিকাদারের পক্ষে নিয়োজিত বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আজিজুল আকিল ডেভিডের এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই দুর্নীতির মূল নেপথ্যে ছিল।

​ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে পদ্মা থেকে পানি এনে মুন্সীগঞ্জের যশলদিয়ায় শোধন করে ঢাকায় সরবরাহের জন্য প্রায় চার হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তবে প্রয়োজনীয় সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, দুই হাজার কোটি টাকার পাইপ কেনায় ৫০০ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। পাইপে ত্রুটি দেখা দেওয়া সত্ত্বেও ওয়াসার খরচে তা মেরামত করা হয় এবং ঠিকাদারকে ৩৬০ কোটি টাকার জামানত ফেরত দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত শোধনাগারে উৎপাদনে দৈনিক প্রায় ২০ কোটি লিটার (৪৪%) ঘাটতি ছিল। সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ও আত্মসাতের অর্থ মিলিয়ে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা।

​সিন্ডিকেটের কারসাজিতে প্রকল্পের নির্মাণ ও কারিগরি মান চরমভাবে ব্যাহত হয়। ২০১৪ সালে কম পুরুত্বের 'কে-৯ ডাকটাইল' পাইপ পাঠাতে অস্বীকৃতি জানালে তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক এমএ রশীদ সিদ্দিকীকে চাপ দিয়ে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বুয়েটে পাইপ পরীক্ষা না করেই তা গ্রহণ করা হয়। ডেনমার্কের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘গ্রন্টমিজ’-এর বিশেষজ্ঞ বোদো গোপাট আন্তর্জাতিক মানের নয় এমন একটি প্রস্তাব বাতিল করলে তাকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে পূর্ণ সক্ষমতায় পাম্প চালাতে গেলে সঞ্চালন লাইনের দুটি স্থানে পাইপ ফেটে সড়ক ও ভবনের ক্ষতি হয়। ফলে এরপর আর কখনো পূর্ণ সক্ষমতায় শোধনাগার চালানো সম্ভব হয়নি।

​সিন্ডিকেটের সদস্যরা অবৈধ অর্থ পাচার ও নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণে যুক্ত ছিলেন। রফিকুল ও ডেভিড যুক্ত থাকা ‘ন্যাশনাল ডিজাইন অ্যান্ড কনসালট্যান্ট লিমিটেড’ নানা কাজ পায়। অভিযুক্ত তাকসিম, রফিকুল ও ডেভিড মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম করেছেন এবং রফিকুল দুর্নীতির অর্থ ভারতের মুর্শিদাবাদে এবং শেখ রেহানা লন্ডনে পাচার করেছেন বলে তথ্য মিলেছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তাকসিম ই-মেইলে পদত্যাগ করে আত্মগোপনে যান এবং রফিকুল সম্প্রতি অবসরে গেছেন।

​অভিযোগের বিষয়ে আজিজুল আকিল ডেভিড জানান, সরকারের তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা হওয়া উচিত। তবে তিনি কোনো সরাসরি ব্যাখ্যা দেননি। অন্যদিকে নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান ও ওয়াসা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. গোলাম মোস্তফা পুরো ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও অসাধু চক্রের জালিয়াতি হিসেবে উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নিশ্চিত করেছেন যে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এইচ/এম

সম্পর্কিত খবর