অনলাইনে খাবার অর্ডার ও ডেলিভারি সেবায় পরিচিত প্রতিষ্ঠান ফুডপ্যান্ডাকে ঘিরে অসন্তোষ বাড়ছে।
ফুডপ্যান্ডার হয়ে কাজ করা রাইডারদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় রাস্তায় কাজ করেও আয় থেকে প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দেওয়ার পর খুব সামান্য অর্থ অবশিষ্ট থাকে। মোটরসাইকেল বা বাইসাইকেল রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি এবং মোবাইল ডেটার ব্যয় বহন করতে গিয়ে তাদের উপার্জনের বড় অংশ খরচ হয়ে যায়। দূরত্ব ও শ্রমের তুলনায় ডেলিভারি চার্জ কম এবং ইনসেনটিভ পাওয়ার শর্ত কঠিন হওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
রাইডারদের আরও অভিযোগ, যানজট, রেস্তোরাঁয় খাবার তৈরিতে বিলম্ব কিংবা গ্রাহকের অবস্থান খুঁজে পেতে সমস্যার মতো পরিস্থিতিতেও ডেলিভারি দেরি হলে তাঁদের বিরুদ্ধে জরিমানা বা অ্যাকাউন্ট স্থগিতের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এসব ঘটনায় যথাযথ তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ সব সময় পাওয়া যায় না বলেও দাবি তাঁদের।
রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার রাইডার সাইফুল ইসলাম জানান, দিনের বড় একটি সময় রাস্তায় কাটিয়ে অর্ডার পৌঁছে দিতে হয়। কিন্তু জ্বালানি, মোবাইল ডেটা ও যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মেটানোর পর আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী থাকে না। তাঁর মতে, কাজের দূরত্ব ও চাপ বিবেচনায় ডেলিভারি চার্জ নির্ধারণ করা এবং রাইডারদের জীবনযাপনের উপযোগী আয় নিশ্চিত করা জরুরি।
জুনায়েদ হাসান নামের আরেক রাইডারের অভিযোগ, যানজট কিংবা রেস্তোরাঁয় খাবার প্রস্তুত হতে দেরি হলে অনেক সময় তাঁদের কিছু করার থাকে না। তারপরও নির্ধারিত সময়ে ডেলিভারি দিতে না পারার দায় তাঁদের ওপর বর্তায়। তাঁর মতে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট রাইডারের বক্তব্য শোনা এবং ঘটনার নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
দুর্ঘটনা ও চিকিৎসা ব্যয় নিয়েও উদ্বেগ
রাইডারদের কাজের পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে কাজ করার সময় দুর্ঘটনা ঘটলে চিকিৎসার ব্যয় নিজেদের বহন করতে হয়। অসুস্থতা কিংবা আঘাতের কারণে কাজ বন্ধ রাখতে হলে উপার্জনও কমে যায়।
চট্টগ্রামের রাইডার মামুন হোসাইন বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়া, যানজট ও সড়কের ঝুঁকি মোকাবিলা করেই তাঁদের কাজ করতে হয়। দুর্ঘটনায় চিকিৎসা ব্যয় এবং কর্মবিরতির কারণে আর্থিক সংকট তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে রাইডারদের দুর্ঘটনাবিমা, জরুরি সহায়তা ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
কমিশন ও বাড়তি খরচে বিপাকে রেস্তোরাঁ মালিকেরা
ফুডপ্যান্ডার পার্টনার রেস্তোরাঁগুলোর মালিকদের মধ্যেও কমিশন ও অন্যান্য চার্জ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। তাঁদের দাবি, প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে অর্ডার বাড়লেও কমিশন, বিজ্ঞাপন, প্রচার এবং বিভিন্ন ছাড়ের ব্যয় মেটানোর পর প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি রেস্তোরাঁগুলোর জন্য এসব খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নির্ধারিত কমিশনের পাশাপাশি প্রচারমূলক কার্যক্রম, বিজ্ঞাপনে অংশগ্রহণ, বিশেষ অবস্থানে রেস্তোরাঁর তালিকা প্রদর্শন এবং বিভিন্ন ডিসকাউন্টের কারণে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে বিক্রি বাড়লেও প্রকৃত লাভের পরিমাণ আশানুরূপ হয় না।
পাশাপাশি অর্থ পরিশোধ ও হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়েও কিছু রেস্তোরাঁ মালিক প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, চুক্তিতে কমিশনের হার নির্ধারিত থাকলেও অন্যান্য সেবার চার্জ যুক্ত হওয়ায় বিক্রির বিপরীতে প্রকৃত আয় হিসাব করা জটিল হয়ে পড়ে।
কমিশন নিয়ে বিরোধ, চট্টগ্রামে সেবা বন্ধের ঘোষণা
কমিশন ও অতিরিক্ত চার্জ কমানোর দাবিতে চট্টগ্রামে ফুডপ্যান্ডার সেবা বন্ধ রাখার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির চট্টগ্রাম মহানগর শাখা। কর্মসূচির অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট রেস্তোরাঁগুলোকে ফুডপ্যান্ডার অর্ডার গ্রহণের জন্য ব্যবহৃত ট্যাব বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
প্রাথমিকভাবে ৫ অক্টোবর থেকে কর্মসূচি শুরুর কথা থাকলেও পরে তা পরিবর্তন করে ৬ অক্টোবর থেকে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
রাইডারদের পারিশ্রমিক ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, রেস্তোরাঁর কমিশন কাঠামো এবং অতিরিক্ত চার্জ নিয়ে এসব অভিযোগের ফলে ফুডপ্যান্ডার সেবা পরিচালনা ও অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
এসআর