[email protected] শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকারি হিসাবে সার পর্যাপ্ত, তবু মাঠে সংকটে কৃষক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:১৩ পিএম

সংগৃহীত ছবি

আমন মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগ করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের ভোগান্তিতে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

সরকারি দামে সার বিক্রির কথা থাকলেও অনেক এলাকায় চাহিদামতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও ডিলারের দোকানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আবার কোনো কোনো এলাকায় বাড়তি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা।

 

সার না পাওয়াকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এমনকি ডিলারের গুদাম ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। এতে সার সরবরাহ নিয়ে মাঠপর্যায়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও অসন্তোষ।

 

তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। সরকারি তথ্যেও চাহিদার চেয়ে বেশি সার থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও কৃষকের কাছে প্রয়োজনের সময় সার পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে কেন—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

 

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে সার পেতে দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করে এক পরিবেশকের গুদামে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। একই জেলার ভূরুঙ্গামারীতে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ এবং কথিত সার সিন্ডিকেট বন্ধের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কৃষকেরা। লালমনিরহাটেও একই দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করা হয়।

 

নাগেশ্বরীর কচাকাটা বাজারে সার সংগ্রহের জন্য সকাল থেকে অপেক্ষমাণ কৃষকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলে একপর্যায়ে গুদামের টিনের বেড়া ভাঙচুর করা হয়। কৃষকদের অভিযোগ, গুদামে সার মজুত থাকার পরও দীর্ঘ সময় পরিবেশকের লোকজন সেখানে উপস্থিত না হওয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

 

এসব ঘটনার পর কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কিছু অসাধু ডিলার ও সংশ্লিষ্ট একটি মহল কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও সার নিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয়ের দাবি। পাশাপাশি আসন্ন রবি মৌসুমের কথা বিবেচনায় নিয়ে কিছু কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সার সংগ্রহের চেষ্টা করছেন বলেও জানানো হয়েছে।

 

তবে কৃষকদের প্রশ্ন, সরকারি গুদামে যদি পর্যাপ্ত সার থাকে, তাহলে ডিলারের দোকানে সেটি পাওয়া যাচ্ছে না কেন? বরাদ্দের সার উত্তোলন ও বিতরণে বিলম্ব হচ্ছে কি না, পরিবেশকরা অতিরিক্ত মজুত করে রাখছেন কি না কিংবা সরবরাহের কোনো পর্যায়ে গিয়ে সার আটকে যাচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

 

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে সব ধরনের সারের প্রয়োজন হবে ৩৫ লাখ ২০ হাজার টন। এর বিপরীতে সরকারের হাতে প্রায় ৫১ লাখ ৮৩ হাজার টন সার রয়েছে বলে হিসাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় মজুত থাকার কথা প্রায় ১৬ লাখ ৬৩ হাজার টন বেশি।

 

অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইউরিয়া সারের চাহিদা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ২৯ হাজার টন। একই সময়ে টিএসপির চাহিদা ৪ লাখ ৬৭ হাজার টন, ডিএপি ১০ লাখ ২৩ হাজার টন এবং এমওপি ৬ লাখ টন।

 

সরকারি হিসাবে ওই সময়ের মোট জোগান ৩৫ লাখ ২০ হাজার টন। এর মধ্যে ইউরিয়া ১৭ লাখ ৪৬ হাজার, টিএসপি ৯ লাখ ৪৫ হাজার, ডিএপি ১৩ লাখ ৮৪ হাজার এবং এমওপি ১১ লাখ টন। সব মিলিয়ে মজুতের পরিমাণ প্রায় ৫১ লাখ ৮৩ হাজার টন।

 

মজুতের এই হিসাবের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের চিত্রের অবশ্য মিল পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার নির্ধারিত ৫০ কেজি ডিএপি সারের দাম ১ হাজার ৫০ টাকা। কিন্তু বিভিন্ন জেলার কৃষকদের অভিযোগ, একই পরিমাণ সার ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দামে কিনতে হচ্ছে। এতে কোনো কোনো এলাকায় সরকারি দামের প্রায় দ্বিগুণ অর্থ গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।

 

সার সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের বিষয়টি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনাতেও উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্টে কয়েকটি জেলার ডিলাররা সরকারি গুদাম থেকে তাদের বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক সার উত্তোলন করেছেন।

 

এ বিষয়ে ১৫ জেলার কৃষি কর্মকর্তারা মন্ত্রণালয়কে যথাসময়ে অবহিত না করায় পরে তদন্ত শুরু হয়। ঘটনায় ওই ১৫ জেলার কৃষি কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চারজন জেলা কৃষি কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার এবং আরও চারজনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের দুই কর্মকর্তাকেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এসআর

সম্পর্কিত খবর