[email protected] বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
২০ কার্তিক ১৪৩৩

‘তরুণরাই বদলে দেবে পৃথিবী’ জাতিসংঘে ইউনূসের বার্তা

মোঃ আলী আকবর রনী

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২:৪৪ এএম

নিউইয়র্ক থেকে এম. এ. রনী: দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কার্বন নিঃসরণমুক্ত একটি পৃথিবী গড়তে সামাজিক ব্যবসা, তরুণদের উদ্যোক্তা শক্তি এবং মানবকেন্দ্রিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহের প্রথম দিনে সোমবার নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টের ১১তম আসরে বক্তব্য দেন অধ্যাপক ইউনূস। এবারের আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর এবং ২০৩০ সালকে সামাজিক ব্যবসার বছর হিসেবে সামনে রেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের পথ খোঁজা। 

অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান, তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস-হোর্তা, ব্রাজিলের সামাজিক উন্নয়ন ও সহায়তা, পরিবার ও ক্ষুধামুক্তিমন্ত্রী ওয়েলিংটন দিয়াসসহ বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি, উদ্যোক্তা, তরুণ ও সামাজিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

কূটনীতির ভাষায় স্পষ্টতার আহ্বান: বক্তব্যের শুরুতেই বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষা নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেন, কূটনৈতিক আলোচনায় অনেক সময় শব্দের প্রকৃত অর্থ হারিয়ে যায়। ফলে যুদ্ধ, শান্তি ও মানুষের অধিকার—এ ধরনের মৌলিক বিষয় নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশন সেই বিভ্রান্তি কাটিয়ে শব্দের প্রকৃত অর্থ ও মানুষের প্রত্যাশাকে সামনে আনার সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তার মতে, বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও মানবিক ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা করছে। জাতিসংঘের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো জরুরি।

৫০ বছরের ক্ষুদ্রঋণ, বদলেছে প্রান্তিক মানুষের জীবন: বক্তব্যে ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছরের পথচলার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেন, ক্ষুদ্রঋণ শুধু উন্নয়নশীল দেশেই নয়, উন্নত বিশ্বের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনেও পরিবর্তন আনতে পারে।

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত ‘গ্রামীণ আমেরিকা’ কর্মসূচির উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি। নিউইয়র্কে ২০০৮ সালে মাত্র ৫০০ ডলারের ঋণসীমা নিয়ে কার্যক্রম শুরু করা এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ বিতরণ করেছে বলে জানান তিনি। ঋণ পরিশোধের হারও প্রায় শতভাগ বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক ইউনূস।

বিশেষ করে হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও এই কর্মসূচির আওতায় আনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রান্তিক মানুষকে আর্থিক সুযোগ দিলে তারাও নিজেদের জীবন ও অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনতে পারেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে আমানত গ্রহণ ও সঞ্চয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কিছু আইনি সীমাবদ্ধতার কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন তিনি।

‘মুনাফা নয়, মানুষের সমস্যার সমাধান’ সামাজিক ব্যবসার ধারণা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, অর্থ উপার্জন মানুষকে সুখী করতে পারে। কিন্তু অন্য একজন মানুষের জীবনকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করার মধ্যে যে আনন্দ, তা ভিন্ন মাত্রার।

তার মতে, সামাজিক ব্যবসার মূল লক্ষ্য কেবল মুনাফা অর্জন নয়; মানুষের কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করে তার কার্যকর সমাধান তৈরি করা।

বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবসার বিভিন্ন উদ্যোগের উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি। জানান, এ ধরনের উদ্যোগের আওতায় বর্তমানে ১৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।

গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দূরবর্তী এলাকার মানুষ সরাসরি চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরামর্শ নিতে পারছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

চক্ষু চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সামাজিক ব্যবসাভিত্তিক একটি স্বনির্ভর হাসপাতাল নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার কথা তুলে ধরেন অধ্যাপক ইউনূস। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত আয় ব্যবহার করে নতুন হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

‘তরুণরা শুধু চাকরি খুঁজবে না, উদ্যোক্তা হবে’ তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নিজের ভাবনার কথা তুলে ধরেন অধ্যাপক ইউনূস। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত তরুণদের চাকরিপ্রার্থী হিসেবে তৈরি করে—এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষ জন্মগতভাবেই উদ্যোক্তা।

তরুণদের সেই উদ্যোক্তা-সত্তাকে বিকশিত করার জন্য নতুন ধরনের শিক্ষা ও পরিবেশ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী ডিসেম্বর থেকে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’র কার্যক্রম শুরু করার কথা জানান অধ্যাপক ইউনূস। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়টির লক্ষ্য হবে তরুণদের কেবল সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব সমস্যা সমাধান ও উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রস্তুত করা।

"তিন শূন্যের পৃথিবী" বক্তব্যের শেষদিকে অধ্যাপক ইউনূস তার দীর্ঘদিনের ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ ধারণার কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ।

এই লক্ষ্য অর্জনে তরুণ প্রজন্ম, সামাজিক ব্যবসা এবং প্রযুক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে বিচার করলে হবে না; সেই পৃথিবী হতে হবে মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, পরিবেশের জন্য টেকসই এবং তরুণদের জন্য সম্ভাবনাময়।

জাতিসংঘের এই সাইড ইভেন্টে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও তরুণদের সামনে অধ্যাপক ইউনূসের বক্তব্যে সামাজিক ব্যবসা, প্রযুক্তি ও তরুণ নেতৃত্বকে বৈশ্বিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরা হয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এবারের আয়োজনের লক্ষ্যও ছিল সামাজিক ব্যবসা, তরুণ নেতৃত্ব ও মানবকেন্দ্রিক প্রযুক্তির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কার্যকর বৈশ্বিক সমাধান এগিয়ে নেওয়া। 

 

এসআর

সম্পর্কিত খবর