চৈত্রের শেষ প্রহর গুনছে সময়।
দুপুরের তাপদাহ কিছুটা কমে এলে বিকেলের হালকা কালবৈশাখীর ছোঁয়া যেন আগাম বার্তা দেয়, দোরগোড়ায় এসে গেছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ।
নগরজীবনের ব্যস্ততা, যানজট আর প্রখর গরমকে উপেক্ষা করেই শুরু হয়েছে উৎসবের কেনাকাটার ধুম।
ফুটপাত থেকে অভিজাত শপিংমল—সবখানেই লাল-সাদাসহ নানা রঙের পোশাকের সমারোহ।
তবে এবার শুধু পোশাকেই সীমাবদ্ধ নয় আয়োজন; মানুষের আগ্রহ বাড়ছে মাটির গয়না, রঙিন সরা, মৃৎশিল্প ও লোকজ পণ্যের প্রতিও।
বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ।
মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ঘিরে সেখানে এখন ব্যস্ততার শেষ নেই। শিক্ষার্থীরা তৈরি করছেন হাতি, পাখিসহ বড় বড় নান্দনিক কাঠামো, পাশাপাশি মাটির সরায় ফুটিয়ে তুলছেন ঐতিহ্যবাহী আলপনা।
বিশেষভাবে নজর কাড়ছে চারুকলার সামনের দীর্ঘ দেয়ালজুড়ে আঁকা বিশাল দেয়ালচিত্র, যেখানে রঙ-তুলির ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠছে গ্রামীণ বাংলার নানা অনুষঙ্গ। এসব শিল্পকর্মের সামনে ভিড় জমিয়ে ছবি তুলছেন দর্শনার্থীরা, যা উৎসবের আগাম আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলছে।
ফ্যাশনেও এসেছে নতুন মাত্রা। একসময় লাল-সাদার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন বৈশাখী পোশাকে যুক্ত হয়েছে রঙের বৈচিত্র্য ও নকশার ভিন্নতা। নকশিকাঁথা, পটচিত্র ও লোকজ মোটিফে সাজানো পোশাক পাচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব।
শপিংমলের পাশাপাশি দোয়েল চত্বর ও তাঁতপল্লিগুলোতেও ভিড় বাড়ছে। সুতির শাড়ি ও খাদি পাঞ্জাবিতে মানুষ খুঁজছে স্বস্তি ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া। অনেকেই এখন কৃত্রিম কাপড়ের বদলে দেশীয় তাঁত ও প্রাকৃতিক রঙের পোশাকের প্রতি ঝুঁকছেন।
তবে কেনাকাটার বাইরে বৈশাখের বড় আকর্ষণ বাঙালির খাবার সংস্কৃতি। পান্তা-ইলিশ আর নানা পদের ভর্তা নিয়ে চলছে ঘরোয়া পরিকল্পনা। ইলিশের দাম বা বাজারের ভিড়, কিছুই থামাতে পারছে না ভোজনরসিকদের উৎসাহ।
পান্তার সঙ্গে শুঁটকি না আলুভর্তা—এই নিয়েই জমে উঠছে আড্ডা। নগরজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও মাটির প্লেটে পান্তা খাওয়ার এই টান যেন শেকড়ে ফেরার এক অনন্য প্রকাশ।
রমনার বটমূলে ছায়ানটের ভোরের আয়োজন এবং মঙ্গল শোভাযাত্রার বর্ণিল উপস্থাপনা মিলিয়ে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে জাতিগত ঐক্যের প্রতীক। এটি কেবল একটি উৎসব নয়, বরং বাঙালির আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের দিন।
যান্ত্রিক জীবনের ভিড়ে ঐতিহ্যের প্রতি এই আকর্ষণই প্রমাণ করে—শেকড়কে আমরা এখনো আঁকড়ে আছি।
নতুন বছরের আহ্বানে সব বিভেদ ভুলে প্রাণে প্রাণে জেগে উঠুক নতুনের আনন্দ।
বৈশাখের রঙিন উৎসব ছড়িয়ে দিক প্রাণশক্তি, বাঁচিয়ে রাখুক বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
এসআর