[email protected] সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
২৯ চৈত্র ১৪৩২

হামের প্রাদুর্ভাব: বৈশ্বিক সংকট নাকি অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা?

এম. এ রনী

প্রকাশিত: ১২ এপ্রিল ২০২৬ ৯:৪৪ এএম

একসময় নিয়ন্ত্রণে আসা হামের বর্তমান উদ্বেগজনক পরিস্থিতির পেছনে কেবল বৈশ্বিক মহামারি নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্য খাতের গভীর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও নীতিনির্ধারণী অদক্ষতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের

 অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল এক বিশ্লেষণে এই সংকটের মূল কারণগুলো তুলে ধরেছেন।

​টিকার কভারেজ হ্রাস: হাম ঠেকাতে ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকা দেওয়া জরুরি। কিন্তু কোভিড পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে পড়ার প্রভাবে বাংলাদেশেও এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।

​প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা: টিকা, সিরিঞ্জ ও কোল্ড-চেইন সরঞ্জাম সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা এবং ক্রয় প্রক্রিয়ার অদক্ষতা মাঠপর্যায়ের টিকাদান কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

​নীতিগত শূন্যতা: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য খাতের ‘অপারেশনাল প্ল্যান’ (OP) পুনর্গঠনের সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই পুরনো কাঠামো ভেঙে ফেলায় অর্থছাড় ও ক্রয় প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে, যার ফলে টিকার মজুত কমে যায়।

​গ্যাভি (Gavi) তহবিলের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: প্রতিবেশী দেশগুলো সরাসরি গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (Gavi) তহবিল পরিচালনা করলেও বাংলাদেশ এখনো ইউনিসেফ বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওপর নির্ভরশীল। এই মধ্যস্থতাকারী ব্যবস্থার কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ধীরগতি তৈরি হয়।

​১. কর্মী সংকট ও ধর্মঘট: স্বাস্থ্য সহকারীদের অভাব এবং বিভিন্ন সময়ে তাদের কর্মবিরতির ফলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

২. তথ্যের অভাব: সঠিক ডাটা না থাকায় কোন এলাকায় ‘জিরো-ডোজ’ বা টিকা না নেওয়া শিশু বেশি, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

৩. আঞ্চলিক বৈষম্য: জাতীয়ভাবে কভারেজ ভালো দেখালেও শহরের বস্তি ও দুর্গম এলাকায় টিকাদানের হার অনেক কম, যা সংক্রমণের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।

​ক্র্যাশ প্রোগ্রাম: বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ ‘ক্যাচ-আপ’ কর্মসূচি চালু করতে হবে।

​অবকাঠামো সংস্কার: স্বাস্থ্য খাতের শূন্যপদ পূরণ, স্থানীয় পর্যায়ে মাইক্রোপ্ল্যানিং জোরদার এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি শিশুর টিকার ফলো-আপ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

​সরাসরি ব্যবস্থাপনা: Gavi-র মতো আন্তর্জাতিক তহবিলগুলো সরাসরি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে যাতে অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্থতা ও সময়ক্ষেপণ কমানো যায়।

​পরিশেষে, হামের এই পুনরুত্থান কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জ। অতীতের সাফল্যকে পুঁজি করে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটার ঝুঁকি থেকে যায়।

এসআর

সম্পর্কিত খবর