নাহিদ রানার আগুনঝরা বোলিংয়ে মিরপুরে ছারখার হয়ে গেল পাকিস্তান। শেষ দিনে গতি, বাউন্স ও রিভার্স সুইংয়ের দুর্দান্ত প্রদর্শনীতে ১০৪ রানের দাপুটে জয় তুলে নিয়ে তিন ম্যাচ সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।
মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে যেন তৈরি হয়েছিল এক অন্যরকম বিকেল। গ্যালারিতে দর্শক সংখ্যা খুব বেশি নয়, হাজার দুয়েকের মতো। কিন্তু শেষ বিকেলে সেই অল্প সংখ্যক দর্শকের কণ্ঠেই যেন কেঁপে উঠছিল পুরো মিরপুর। চারপাশে শুধু একটি নাম—“নাহিদ… নাহিদ…”। আর সেই গর্জনের মাঝেই আগুনঝরা বোলিংয়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করলেন তরুণ পেসার নাহিদ রানা। গতি, বাউন্স এবং রিভার্স সুইংয়ের দুর্দান্ত মিশেলে টেস্টের পঞ্চম দিনের শেষ সেশনে তিনি রচনা করলেন ফাস্ট বোলিংয়ের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
নাহিদ রানার আগুনে স্পেলের সঙ্গে তাসকিন ও তাইজুল-এর নিখুঁত আক্রমণে শেষ দিনে একেবারেই দাঁড়াতে পারেনি পাকিস্তান। ২৬৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান অলআউট হয়ে যায় মাত্র ১৬৩ রানে। ফলে ১০৪ রানের দাপুটে জয়ে তিন ম্যাচ সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে গিয়ে ২-০ ব্যবধানে ঐতিহাসিক সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। তবে দেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। সেই কারণেও মিরপুরের এই জয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।
এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সময়। প্রথম চার দিনের মধ্যে দুই দিনই বৃষ্টিতে দীর্ঘ সময় খেলা বন্ধ ছিল। ফলে শেষ দিনে বাংলাদেশকে শুধু পাকিস্তানের বিপক্ষেই নয়, সময়ের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে যখন নাজমুল হোসেন শান্ত ইনিংস ঘোষণা করেন, তখন ম্যাচে বাকি ছিল মাত্র ৭৬ ওভার। আলোর স্বল্পতার কারণে সব ওভার পাওয়া নিয়েও ছিল শঙ্কা। কিন্তু শেষ বিকেলে নাহিদ রানার বিধ্বংসী স্পেল পুরো ম্যাচের চিত্র বদলে দেয়। নির্ধারিত সময়েরও ২৩.১ ওভার আগেই জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।
দিনের শুরুতে ৩ উইকেটে ১৫২ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ। আগের দিনের অপরাজিত ব্যাটার মুশফিকুর রহিম আর মাত্র ৬ রান যোগ করেই মিড অফে ক্যাচ দেন। লিটন দাস-ও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। শাহিন শাহ আফ্রিদির শর্ট বলে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে বাউন্ডারিতে ধরা পড়েন তিনি।
তবে এক প্রান্ত আগলে রেখে দুর্দান্ত ব্যাটিং চালিয়ে যান অধিনায়ক শান্ত। ৫৮ রান নিয়ে দিন শুরু করা এই বাঁহাতি ব্যাটার এগিয়ে যাচ্ছিলেন ম্যাচে নিজের দ্বিতীয় শতকের দিকে। এর আগেও এক ম্যাচে দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি করার কীর্তি আছে তার। কিন্তু এবার শেষ পর্যন্ত শতক থেকে বঞ্চিত হন মাত্র ১৩ রানের জন্য। দ্রুত রান তোলার চেষ্টায় নোমান আলিকে রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন তিনি ৮৭ রানে। তার ইনিংসটি সাজানো ছিল ধৈর্য, দায়িত্ববোধ এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতার মিশেলে।

শান্ত আউট হওয়ার পর দ্রুত রান তোলার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তিনটি চার ও একটি ছক্কায় ২৪ রানের কার্যকর ইনিংস খেলেন তিনি। নিচের সারিতে নেমে তাসকিন আহমেদও একটি চার ও একটি ছক্কা হাঁকান। লাঞ্চের আগেই ২৪০/৯ সংগ্রহে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের সেই সিদ্ধান্ত যে কতটা সঠিক ছিল, তার প্রমাণ মেলে পাকিস্তানের ইনিংসের শুরুতেই। লাঞ্চের পর প্রথম ওভারেই ইমাম-উল-হককে ফিরিয়ে দলকে কাঙ্ক্ষিত সূচনা এনে দেন তাসকিন। তবে প্রথম ইনিংসে শতরানের জুটি গড়া দুই অভিষিক্ত ব্যাটার আজান আওয়াইস ও আব্দুল্লাহ ফাজাল আবারও প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন।

এই জুটিও বেশিক্ষণ টিকতে দেননি মিরাজ। ১৫ রান করা আজানকে বোল্ড করে ভাঙেন ৫৪ রানের জুটি। অন্যদিকে অভিষেক ম্যাচেই দ্বিতীয় ইনিংসে আরেকটি ফিফটি তুলে নেন আব্দুল্লাহ ফাজাল। ১০টি চার মেরে ৬৬ রানের দারুণ ইনিংস খেলেন তিনি। সালমান আলি আগার সঙ্গে তার জুটি কিছু সময়ের জন্য বাংলাদেশকে চাপে ফেলে দেয়।
শেষ সেশনে পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ১৫২ রান, হাতে ৭ উইকেট। ঠিক তখনই ম্যাচে শুরু হয় বাংলাদেশের পেস আক্রমণের ঝড়। চা-বিরতির পর প্রথম ওভারেই তাইজুল ইসলাম-এর অসাধারণ ফ্লাইট ও টার্নে থেমে যান ফাজাল। ৬৬ রানে আউট হয়ে ফেরেন তিনি।

পরের ওভারে তাসকিন যখন সালমান আলি আগাকে ফিরিয়ে দেন, তখন মিরপুরের গ্যালারিতে জয়ের গন্ধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর শুরু হয় নাহিদ রানার তাণ্ডব। তার প্রতিটি ডেলিভারিই যেন পাকিস্তানি ব্যাটারদের জন্য আতঙ্ক হয়ে উঠেছিল। কখনও ১৪৫ কিলোমিটার গতির আগুনঝরা বল, কখনও ভয়ংকর বাউন্সার, আবার কখনও রিভার্স সুইং—সব মিলিয়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপকে এলোমেলো করে দেন তিনি।
বিশেষ করে পুরোনো বলে তার রিভার্স সুইং ছিল চোখে পড়ার মতো। লেট মুভমেন্ট আর ভয়ংকর গতি সামলাতে গিয়ে একের পর এক ভুল করেছেন পাকিস্তানি ব্যাটাররা। ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে ৪০ রানে ৫ উইকেট নেন নাহিদ। এই স্পেল ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ফাস্ট বোলিং স্পেল হিসেবে আলোচনায় চলে এসেছে।
নাহিদের বোলিংয়ের সময় মিরপুরের পরিবেশও ছিল অসাধারণ। প্রতিটি ডেলিভারির আগে দর্শকদের চিৎকার, উইকেটের পর উন্মাদনা আর সতীর্থদের আগ্রাসী উদযাপন—সব মিলিয়ে পুরো স্টেডিয়াম যেন এক বিদ্যুতায়িত আবহ তৈরি করেছিল। অনেক ক্রিকেটপ্রেমীর মতে, দীর্ঘদিন পর মিরপুরে এমন ভয়ংকর ও আধিপত্যপূর্ণ পেস বোলিং দেখল বাংলাদেশ।
অধিনায়ক শান্তও ম্যাচজুড়ে অসাধারণ নেতৃত্ব দিয়েছেন। ব্যাট হাতে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসের পাশাপাশি বোলারদের ব্যবহারে ছিলেন দারুণ কৌশলী। ম্যাচ শেষে তার নেতৃত্বেরও প্রশংসা করেছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।
ম্যাচ শেষে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। আর ম্যাচসেরা হয়েছেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। তবে এই জয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল ছবি হয়ে থাকবেন নাহিদ রানা। কারণ শেষ বিকেলে তার আগুনে স্পেল শুধু একটি ম্যাচ জেতায়নি, বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছে কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীকে।
সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড: বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৪১৩, পাকিস্তান ১ম ইনিংস: ৩৮৬
বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ৭০.৩ ওভারে ২৪০/৯ ডি.। নাজমুল হোসেন শান্ত ৮৭, মুশফিকুর রহিম ২২, লিটন দাস ১১, মেহেদী হাসান মিরাজ ২৪, তাসকিন আহমেদ ১১
পাকিস্তানের বোলিং: হাসান ৩ উইকেট, শাহিন শাহ আফ্রিদি ২ উইকেট, হাসান আলি ৩ উইকেট, মোহাম্মদ আব্বাস ১ উইকেট
পাকিস্তান ২য় ইনিংস (লক্ষ্য ২৬৮): ১৬৩ অলআউট, আব্দুল্লাহ ফাজাল ৬৬, সালমান আলি আগা ২৬
বাংলাদেশের বোলিং: নাহিদ রানা ৫/৪০, তাসকিন আহমেদ ২ উইকেট, তাইজুল ইসলাম ১ উইকেট, মিরাজ ১ উইকেট
ফল: বাংলাদেশ ১০৪ রানে জয়ী, সিরিজ: তিন ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে,
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: নাজমুল হোসেন শান্ত
এসআর