পরিকল্পনার কথা শোনা যায়, কিন্তু মাঠে নেই তার প্রতিফলন—এবার উঠছে স্বজনপ্রীতি ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ। টেকনিক্যাল কাঠামোতে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার প্রশ্নের পাশাপাশি এবার উঠছে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও। সব মিলিয়ে ফুটবলের উন্নয়ন যাত্রা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন করে সংশয়।
বাংলাদেশ ফুটবলের টেকনিক্যাল কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। সেই কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা সাইফুল বারী টিটু-র সময়কালেও দৃশ্যমান কোনো বড় পরিবর্তন না আসায় নতুন করে শুরু হয়েছে সমালোচনা। ফুটবল সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনা থাকলেও তার বাস্তবায়নে ঘাটতি এবং নেতৃত্বের দুর্বলতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জাতীয় ফুটবলের একটি নির্দিষ্ট দর্শন গড়ে তোলা টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের অন্যতম প্রধান কাজ। কিন্তু বাংলাদেশের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলগুলোর খেলায় এখনো সেই ধারাবাহিকতা দেখা যায় না। U-15, U-17, U-23 থেকে সিনিয়র দল—প্রত্যেকেই খেলছে ভিন্ন ভিন্ন ছকে, যা একটি সমন্বিত কাঠামোর অভাবকেই নির্দেশ করে। দীর্ঘ সময় দায়িত্বে থেকেও এই মৌলিক জায়গায় অগ্রগতি না হওয়া প্রশ্ন তৈরি করছে।

কোচিং লাইসেন্সিং নিয়েও উঠছে গুরুতর অভিযোগ। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন-এর অধীনে কোচদের লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে দাবি করছেন অনেকেই। ফুটবল অঙ্গনে শোনা যাচ্ছে—যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে “মুখ দেখে” লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে, আবার নিজের গণ্ডির বাইরে থাকা কোচদের লাইসেন্স পেতে অনীহা দেখা যায়। এমন অভিযোগ সত্য হলে দেশের কোচিং কাঠামোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
শুধু লাইসেন্সিং নয়, বাফুফের কোচিং প্যানেল গঠন নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। অভিযোগ রয়েছে—নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি কাজ করছে এবং নির্দিষ্ট কিছু কোচ বারবার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে করে যোগ্য অনেক কোচ পিছিয়ে পড়ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের ফুটবল উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো—টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের দায়িত্বে থেকেও সাইফুল বারী টিটু কখনো বয়সভিত্তিক দলের কোচ হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন, আবার কখনো বিভিন্ন কোচিং প্যানেলে নিজের পছন্দের কোচদের যুক্ত করার চেষ্টা করছেন—এমন কথাও ফুটবল মহলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই ধরনের বহুমুখী ভূমিকা টেকনিক্যাল কাঠামোর ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
FIFA ও AFC-এর বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে তার প্রভাব খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। তৃণমূল উন্নয়ন, কোচিং মানোন্নয়ন, লিগ কাঠামো—সব ক্ষেত্রেই অগ্রগতি ধীর, অনেক ক্ষেত্রে স্থবির।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জবাবদিহিতা নিয়ে। দীর্ঘদিন দায়িত্বে থেকেও যদি দৃশ্যমান উন্নতি না আসে এবং একই সঙ্গে যদি স্বজনপ্রীতি ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ ওঠে, তাহলে পুরো টেকনিক্যাল কাঠামো পুনর্মূল্যায়নের দাবি জোরালো হওয়াই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশ ফুটবলের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। নয়তো পরিকল্পনার চক্রেই আটকে থাকবে বাংলাদেশের ফুটবল—আর “সম্ভাবনা” শব্দটাই হয়ে থাকবে একমাত্র সান্ত্বনা।
তাহলে টিটুর আমলে—কোথায় কোথায় এগোয়নি কার্যক্রম? কেন?
জাতীয় ফুটবল দর্শন তৈরির কথা থাকলেও সব বয়সভিত্তিক দলে একক স্টাইল প্রতিষ্ঠা হয়নি এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন স্পষ্ট নয়। কোচ উন্নয়ন ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে; Coaching Education Program এবং লাইসেন্সিং উন্নয়ন সঠিক ভাবে প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যকর হয়নি।
তৃণমূল উন্নয়নে—স্কুল, একাডেমি ও জেলা পর্যায়ে ফুটবল বিস্তার, ট্যালেন্ট স্কাউটিং এবং খেলোয়াড় ডাটাবেস তৈরির কাজ সীমিত অগ্রগতিতে আটকে আছে। জাতীয় দলগুলোর তত্ত্বাবধান ও ট্যাকটিক্যাল উন্নয়নেও ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে।

লিগ কাঠামো উন্নয়ন, প্রতিযোগিতার মান বৃদ্ধি এবং খেলোয়াড়দের ম্যাচ খেলার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ বাস্তবে তেমন ফল দেয়নি। স্পোর্টস সায়েন্স, ডাটা অ্যানালাইসিস ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো পিছিয়ে। আন্তর্জাতিক প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন, নীতিমালা তৈরি, মনিটরিং ও মূল্যায়ন—সব ক্ষেত্রেই কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ক্লাব, কোচ ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সমন্বয়েও ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে “দেশের ফুটবলের স্থপতি” হিসেবে যেসব দায়িত্ব পালন করার কথা, তার অনেকগুলোই টিটুর সময়েও প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিকল্পনার গল্প যতই শোনা যাক, মাঠে তার ছাপ না পড়লে তা শুধু আশার কথাই থেকে যায়। এখন সময়—প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিবর্তনের আলোয় বাংলাদেশ ফুটবলকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার।
এসআর