নতুন করে জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)।
ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থান বদলাতে সংস্থাটি সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
আইসিসির সঙ্গে শ্রীলংকা ক্রিকেট বোর্ডও (এসএলসি) যৌথভাবে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড এবং দেশটির সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
উদ্দেশ্য—ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পাকিস্তানকে রাজি করানো। তবে এখন পর্যন্ত ইসলামাবাদ তাদের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে।
এই ম্যাচ মাঠে না গড়ালে আইসিসি ছাড়াও সম্প্রচার সংস্থা ও বিজ্ঞাপনদাতাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানকে ম্যাচ খেলাতে রাজি করাতে ব্যর্থ হলে আগামী সম্প্রচার চক্রে আইসিসির সঙ্গে চুক্তি নবায়ন নাও করতে পারে জিও হটস্টার।
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে শুধু ক্রিকেটীয় লড়াই নয়, বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে লাভজনক ইভেন্ট হিসেবেই দেখা হয়। আইসিসির অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, এই একটি ম্যাচ থেকেই প্রায় ২০০ কোটি রুপি রাজস্ব আসে, যা প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
২০২৩ সালে জিও হটস্টার প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে আইসিসির সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছিল। ওই চুক্তিতে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের গুরুত্ব ছিল অন্যতম প্রধান বিষয়। এই ম্যাচ বাতিল হলে শুধু চলমান বিশ্বকাপ নয়, ভবিষ্যতের আইসিসি ইভেন্টগুলোর আর্থিক কাঠামোও বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে। নিরাপত্তাজনিত কারণে বিশ্বকাপে অংশ নিতে ভারতে যেতে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ।
এরপর বাংলাদেশ সরকার কিংবা বোর্ডের চূড়ান্ত সম্মতি ছাড়াই আইসিসি তাদের পরিবর্তে স্কটল্যান্ডকে টুর্নামেন্টে অন্তর্ভুক্ত করে। বিশ্ব ক্রিকেট সংস্থার এই সিদ্ধান্তে তীব্র আপত্তি জানায় পাকিস্তান।
বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে আইসিসির এই ভূমিকার প্রতিবাদ হিসেবে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জনের ঘোষণা দেয় পাকিস্তান সরকার। এতে ক্রিকেট বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, শাহীন শাহ আফ্রিদি ও বাবর আজমদের ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামার কোনো সম্ভাবনা নেই।
তবে আইসিসি আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের বহুল আলোচিত ম্যাচটি আয়োজন করতে এখনো আশাবাদী এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতা বিবেচনায় নিয়ে জিও হটস্টার নতুন করে আগের শর্তে চুক্তি নবায়ন নাও করতে পারে। যদি আইসিসি সমমূল্যে অন্য কোনো সম্প্রচারক খুঁজে না পায়, তাহলে সংস্থাটির সামগ্রিক আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে আইসিসির প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হওয়ার কথা, যা বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। এই অর্থ পরে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রাজস্ব ভাগাভাগির মাধ্যমে বণ্টন করা হয়।
আইসিসির আয় কমে গেলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো বোর্ডগুলোর ওপর, যাদের বড় অংশের আয়ই আসে এই রাজস্ব বণ্টন থেকে। একই ঝুঁকিতে পড়বে শ্রীলংকা ও নিউজিল্যান্ডও।
বিপরীতে, দ্বিপাক্ষিক সিরিজ থেকে বড় অঙ্কের আয় করা ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হবে।
সব মিলিয়ে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই সংকট এখন আর একটি ম্যাচে সীমাবদ্ধ নেই—এটি বিশ্ব ক্রিকেটের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
এসআর
মন্তব্য করুন: