[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
২৮ ফাল্গুন ১৪৩২

শিশুকে কত বছর বয়স থেকে রোজার অভ্যাস করানো উচিত?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ মার্চ ২০২৬ ৯:০৩ পিএম

সংগৃহীত ছবি

ইসলামে সন্তানকে সঠিক শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব মা–বাবার ওপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু পার্থিব শিক্ষা নয়, বরং ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা ও ইবাদতের প্রতি আগ্রহী করে তোলার ব্যাপারেও ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে। শিশুদের ধীরে ধীরে ইবাদতে অভ্যস্ত করে তুললে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তারা সহজেই ইসলামের ফরজ বিধানগুলো পালন করতে পারে।


হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন—
مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ لِسَبْعِ سِنِينَ، وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا لِعَشْرِ سِنِينَ، وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ
অর্থাৎ, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও এবং দশ বছর হলে নামাজের জন্য শাসন করো। আর তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।’ (আবু দাউদ: ৪৯৪)


এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ধীরে ধীরে ইবাদতের শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে অনেকের মনে প্রশ্ন আসে— শিশুকে ঠিক কত বছর বয়স থেকে রোজা রাখার অভ্যাস করানো উচিত?
প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর রোজা ফরজ


ফিকহবিদদের মতে, রোজা ফরজ হওয়ার প্রধান শর্ত হলো প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। যদি কোনো শিশুর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে তার ওপর রোজাসহ অন্যান্য ফরজ ইবাদত বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।


আর যদি ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত এমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পায়, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তাকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তখন থেকেই তার ওপর রোজা ফরজ হবে।


দশ বছর বয়সে রোজার অনুশীলন
ফিকহের গ্রন্থে উল্লেখ আছে, যখন কোনো শিশু শারীরিকভাবে রোজা রাখার সামর্থ্য অর্জন করে এবং তার বয়স প্রায় ১০ বছর হয়, তখন তাকে রোজা রাখার অভ্যাস করানো যেতে পারে। আল্লামা আলাউদ্দিন হাসকাফি (রহ.) এ বিষয়ে উল্লেখ করেছেন যে, সক্ষম হলে শিশুকে ধীরে ধীরে রোজা পালনে উৎসাহিত করা উচিত।


সাত বছর বয়স নিয়ে আলেমদের মত
আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) বলেন, কিছু আলেম সাত বছর বয়স থেকে শিশুদের রোজার অনুশীলন করানোর কথা বলেছেন। তবে বাস্তবে দেখা যায়, এই বয়সে পূর্ণদিন রোজা রাখা অধিকাংশ শিশুর জন্য কঠিন হয়ে যায়।


তাই বিষয়টি মূলত শিশুর শারীরিক শক্তি, স্বাস্থ্য এবং মৌসুমের ওপর নির্ভর করে— বিশেষ করে গরম বা শীতের সময়ের ভিন্নতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
যতটা সম্ভব ততদিন রোজা


অনেক সময় শিশু পুরো রমজান মাস রোজা রাখতে পারে না। সে ক্ষেত্রে যতদিন সহজে রাখতে পারে ততদিন রোজা রাখাই যথেষ্ট। পুরো মাসের রোজা রাখা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।


নাবালক শিশুর রোজা ভেঙে গেলে
ফিকহবিদদের মতে, যদি কোনো নাবালক শিশু রোজা রাখার পর তা ভেঙে ফেলে, তাহলে তার ওপর সেই রোজার কাজা করা বাধ্যতামূলক হয় না। (রদ্দুল মুহতার)


বিভিন্ন ইমামের মতামত
ইসলামের বিভিন্ন ইমাম ও আলেম এ বিষয়ে কিছু ভিন্ন মত দিয়েছেন।
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, শিশু যখন রোজা রাখার সক্ষমতা অর্জন করবে, তখন তাকে অনুশীলনের জন্য রোজা রাখতে উৎসাহিত করা উচিত।
ইমাম ইসহাক (রহ.)-এর মতে, প্রায় ১২ বছর বয়সে শিশুদের রোজা রাখার উপযুক্ত সময় হতে পারে।
ইমাম আহমদ (রহ.)-এর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, ১০ বছর বয়সে তাদের রোজার অভ্যাস করানো যেতে পারে।


ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতে, শিশুদের ওপর রোজা বাধ্যতামূলক নয়।
আলেমদের ঐকমত্য
আল্লামা ইবনে বাত্তাল (রহ.) উল্লেখ করেছেন, আলেমদের মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে যে ফরজ ইবাদত কেবল প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরই বাধ্যতামূলক হয়। তবে অধিকাংশ আলেম শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ইবাদতের অনুশীলনে উৎসাহিত করার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে তারা বড় হয়ে সহজে ইবাদত পালন করতে পারে।


হানাফি মাজহাবের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, ছেলে-মেয়েরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর রোজা ফরজ হয়। যদি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কোনো লক্ষণ না দেখা যায়, তাহলে ১৫ বছর পূর্ণ হলে তাকে প্রাপ্তবয়স্ক ধরা হবে।
তবে তার আগে যদি শিশুর মধ্যে রোজা রাখার সামর্থ্য থাকে এবং এতে তার শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে, তাহলে তাকে ধীরে ধীরে রোজার অনুশীলনে উৎসাহিত করা ভালো।
সার্বিকভাবে বলা যায়, শিশুদের ওপর রোজা ফরজ না হলেও ছোটবেলা থেকেই ইবাদতের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বয়স ও শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের রোজা রাখার অভ্যাস করালে ভবিষ্যতে তারা সহজেই ইসলামের ফরজ বিধানগুলো পালন করতে পারবে।

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর