[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
২৮ ফাল্গুন ১৪৩২

রমজানের রাতে মহানবী (সা.) যেসব আমলে বেশি গুরুত্ব দিতেন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ মার্চ ২০২৬ ৫:৩৯ পিএম

সংগৃহীত ছবি

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য রহমত, বরকত ও ক্ষমার বিশেষ সময়।

এ মাসে ইবাদত-বন্দেগির মর্যাদা অন্যান্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) রমজান শুরু হওয়ার আগেই এর জন্য মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি নিতেন। আর রমজান শুরু হলে তিনি পার্থিব ব্যস্ততা কমিয়ে ইবাদতে অধিক মনোযোগ দিতেন। বিশেষ করে রাতের সময় তিনি বিভিন্ন নফল ইবাদত ও আমলে নিমগ্ন থাকতেন। মুসলমানদের জন্য এসব আমলই আদর্শ হিসেবে বিবেচিত।


রমজানের রাতে মহানবী (সা.) যে আমলগুলো বেশি গুরুত্ব দিতেন, তার কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলো—
কুরআন তিলাওয়াত
রমজান মাসে নবীজি (সা.) বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করতেন। এই সময়ে কুরআনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে উঠত। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন—


كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَجْوَدَ النَّاسِ، وَكَانَ أَجْوَدُ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ، وَكَانَ يَلْقَاهُ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ فَيُدَارِسُهُ الْقُرْآنَ
অর্থাৎ, রমজান মাসে প্রতি রাতে হজরত জিবরাইল (আ.) নবীজি (সা.)-এর কাছে আসতেন এবং তারা একে অপরকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। (সহিহ বুখারি: ৩৫৫৪)


তারাবিহ নামাজ
রমজান মাসে তারাবিহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ইবাদত। রোজা ফরজ হওয়ার পরের বছর নবীজি (সা.) কয়েক রাত সাহাবিদের সঙ্গে মসজিদে তারাবিহর নামাজ আদায় করেন। প্রথম রাতে তিনি একা নামাজ পড়তে শুরু করলে সাহাবিরা তার সঙ্গে যোগ দেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় রাতে আরও বেশি মানুষ অংশ নেন। পরে চতুর্থ রাতে তিনি মসজিদে যাননি।


পরবর্তীতে সাহাবিরা কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই নামাজ যদি ফরজ হয়ে যায়—তবে তা উম্মতের জন্য কষ্টকর হতে পারে, সেই আশঙ্কায় তিনি নিয়মিত জামাতে পড়াননি। পরে খোলাফায়ে রাশেদিনের সময়ে, বিশেষ করে হজরত ওমর (রা.)-এর যুগে তারাবিহ জামাতে আদায়ের ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে চালু হয়।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত—


مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
অর্থ: যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে কিয়াম (তারাবিহ) আদায় করবে, তার আগের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি: ২০০৮)


তাহাজ্জুদের নামাজ
নবীজি (সা.) নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। রমজানে তিনি এ ইবাদতে আরও বেশি সময় ব্যয় করতেন এবং রাতের শেষ ভাগে দীর্ঘ সময় ধরে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে ইবাদত করতেন।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন—


مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ وَلَا فِي غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً
অর্থাৎ, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান বা অন্য মাসে সাধারণত ১১ রাকাতের বেশি নামাজ পড়তেন না। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে চার রাকাত, আবার চার রাকাত এবং শেষে তিন রাকাত বিতর আদায় করতেন।
আরও একটি হাদিসে এসেছে—


تَنَامُ عَيْنَايَ وَلَا يَنَامُ قَلْبِي
অর্থ: আমার চোখ ঘুমায়, কিন্তু হৃদয় ঘুমায় না। (সহিহ বুখারি: ৩৫৬৯)
সেহরি গ্রহণ
প্রতিটি রোজার আগে নবীজি (সা.) সেহরি খেতেন এবং সাহাবিদেরও সেহরি গ্রহণে উৎসাহ দিতেন। তিনি সুবহে সাদিকের কিছুক্ষণ আগে সেহরি করতেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—


تَسَحَّرُوا فَإِنَّ فِي السَّحُورِ بَرَكَةً
অর্থ: তোমরা সেহরি গ্রহণ করো, কারণ সেহরিতে বরকত রয়েছে। (সহিহ বুখারি: ১৯২৩)
হজরত জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বর্ণনা করেন—
تَسَحَّرْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ ثُمَّ قُمْنَا إِلَى الصَّلَاةِ
অর্থ: আমরা নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে সেহরি করেছি, এরপর তিনি নামাজের জন্য দাঁড়ালেন।
সেহরি ও ফজরের আজানের মধ্যবর্তী সময় সম্পর্কে তিনি বলেন—


قَدْرُ خَمْسِينَ آيَةً
অর্থাৎ, প্রায় ৫০ আয়াত তিলাওয়াত করার সমপরিমাণ সময়। (সহিহ বুখারি: ১৯২১)
ইফতার
রমজানে সময়মতো ইফতার করাকে নবীজি (সা.) গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই ইফতার করতেন এবং বিলম্ব করতে নিষেধ করতেন।


রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَا يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ
অর্থ: মানুষ ততদিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যতদিন তারা দ্রুত ইফতার করবে। (সহিহ বুখারি: ১৯৫৭)
রমজানের রাতগুলোতে নবীজি (সা.)-এর জীবন ছিল কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ, দোয়া ও আল্লাহর স্মরণে ভরপুর। তাঁর এই আমলগুলো মুসলমানদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। তাই মুমিনদের উচিত রমজানের রাতকে মূল্যবান মনে করে কুরআন পাঠ, তারাবিহ, তাহাজ্জুদ, সেহরি ও সময়মতো ইফতারের মতো সুন্নত আমলগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। এতে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পাশাপাশি রমজানের প্রকৃত শিক্ষা ও বরকত লাভ করা সম্ভব হবে।

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর