অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সিরিজ ড্র, এরপর আইসিসি টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে ইতিহাসের সেরা অবস্থান—বাংলাদেশের ক্রিকেটে যোগ হলো নতুন এক মাইলফলক। সর্বশেষ প্রকাশিত আইসিসি টেস্ট দলীয় র্যাঙ্কিংয়ে তিন ধাপ এগিয়ে নবম থেকে ষষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। টেস্ট ক্রিকেটে এটাই টাইগারদের সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিং।
বাংলাদেশের রেটিং এখন ৭৮ পয়েন্ট। র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, ভারত ও ইংল্যান্ড। অস্ট্রেলিয়া ১২৬ রেটিং নিয়ে শীর্ষে, এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা ১১৯, নিউজিল্যান্ড ১০৬, ভারত ১০৪ ও ইংল্যান্ড ৯৯ রেটিং নিয়ে যথাক্রমে দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম স্থানে আছে।
র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের এই উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সদ্য শেষ হওয়া দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ। সিরিজটি ১-১ সমতায় শেষ করেছে বাংলাদেশ, যা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দুই দলের টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশের প্রথম ড্র।
ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করে। এটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। ম্যাচটিতে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল প্রায় নিখুঁত—ব্যাটিং, বোলিং ও চাপ সামলানোর দক্ষতায় স্বাগতিকদের শুরু থেকেই চাপে রাখে টাইগাররা।
তবে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ম্যাকাইয়ে মাত্র দুই দিনেই বাংলাদেশকে ইনিংস ও ৫১ রানে হারিয়ে সিরিজে সমতা ফেরায় অস্ট্রেলিয়া। মিচেল স্টার্কের বিধ্বংসী বোলিংয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং দুই ইনিংসেই ধসে পড়ে। অস্ট্রেলিয়ার জয়ে স্টার্ক ম্যাচে মোট ১০ উইকেট নেন, যার মধ্যে প্রথম ইনিংসে তাঁর শিকার ছিল ৬ উইকেট।
হারলেও র্যাঙ্কিংয়ে বড় লাফ বাংলাদেশের। মজার বিষয় হলো, সিরিজের শেষ ম্যাচে বড় ব্যবধানে হারলেও র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি থামেনি। দুই ম্যাচের সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ হওয়ায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ রেটিং পয়েন্ট ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলেই ৯ নম্বর থেকে এক লাফে ষষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছে দলটি।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসে পাকিস্তানকে দুই ম্যাচের সিরিজে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের সপ্তম স্থানে উঠেছিল। সেই সময় সপ্তমে ওঠাটিই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসসেরা অবস্থান। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ ড্রয়ের পর সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেল টাইগাররা।
অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে সপ্তম থেকে ষষ্ঠে উঠে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন সংস্করণ মিলিয়েও বাংলাদেশের জন্য এটি বিশেষ অর্জন। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিং ষষ্ঠ, যা ২০১৭ সালে অর্জন করেছিল দলটি। ওই বছর আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে নিউজিল্যান্ডকে হারানোর পর প্রথমবারের মতো ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে ছয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ।
টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অবস্থান ছিল চতুর্থ। আর এবার টেস্টেও ছয়ে উঠে তিন সংস্করণের মধ্যে টেস্টে নিজেদের সর্বোচ্চ অবস্থান নিশ্চিত করল টাইগাররা।
নতুন উচ্চতায় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট। ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। দীর্ঘ সময় র্যাঙ্কিংয়ের নিচের দিকে থাকার পর ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে দলটি। ২০২৬ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয় এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক জয় ও সিরিজ ড্র—দুটি সাফল্যই বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের অগ্রগতির বড় প্রমাণ।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজে প্রথম টেস্ট জয় এবং দুই ম্যাচের সিরিজ ড্র করার পর এবার র্যাঙ্কিংয়েও তার প্রতিফলন দেখা গেল। ষষ্ঠ স্থান শুধু একটি সংখ্যা নয়; বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট কতটা এগিয়েছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
সামনে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিয়মিত টেস্ট খেলার সুযোগ পেলে এই অবস্থান ধরে রাখা এবং আরও ওপরে ওঠার পথও তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও অস্ট্রেলিয়া সিরিজের পর শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে আরও বেশি টেস্ট খেলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক জয়, সিরিজ ড্র এবং এবার টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে ইতিহাসসেরা ষষ্ঠ স্থান—২০২৬ সাল বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের জন্য নিঃসন্দেহে স্মরণীয় এক অধ্যায় হয়ে থাকল।
এসআর