সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুক্ত করে খাদ্য ভর্তুকি ও নগদ সহায়তা ব্যবস্থায় আরও কার্যকরভাবে দরিদ্রদের নির্বাচন করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বর্তমানে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের প্রায় অর্ধেকই কোনো না কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাইরে রয়েছে। ফলে সরকারি সহায়তার উল্লেখযোগ্য অংশ প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। খাদ্য ভর্তুকির বিভিন্ন কর্মসূচি সমন্বয়, নগদ সহায়তার সুবিধাভোগী নির্ধারণে উন্নত পদ্ধতি এবং ফ্যামিলি কার্ডের সমন্বয় করলে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব।
এ জন্য ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ কার্যকর ও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর মাধ্যমে তথ্যের ভিত্তিতে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা পরিবার চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমেছে এবং বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, দারিদ্র্য মোকাবিলায় সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে কারা এসব সহায়তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়, তা যথাযথভাবে নির্ধারণ করা না গেলে সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া কঠিন।
এদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি নিয়েও সতর্কতা জানিয়েছে সংস্থাটি। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। বিনিয়োগের দুর্বলতা, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনীতিতে চাপ অব্যাহত রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে রাজস্ব ঘাটতি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
২০২৬ অর্থবছরে জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন হার বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এতে সরকারের প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করার সক্ষমতাও সীমিত হয়েছে।
তবে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ায় দেশের বহির্বিশ্বমুখী অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা রয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা গেলে ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জ্যাঁ পেসম বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান বাড়াতে এসব সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
সংস্থাটি বলেছে, শুধু সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; সেই অর্থ ও সুবিধা যাতে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এসআর