বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে বাড়তি মুনাফা করার চেষ্টা চলছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে দুটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে।
সচিবালয়ের ওই বৈঠকে দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি আমদানির তথ্য থাকার পরও বাজারে সংকট কেন তৈরি হয়েছে এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কেন সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে, তা জানতে চাওয়া হয়। তবে লোটাবের নেতারা কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য বেড়েছে। দেশে দাম কিছুটা বাড়ানো হলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে।
বৈঠক শেষে জ্বালানিমন্ত্রীর কাছে সাংবাদিকরা বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। নিয়ম অনুযায়ী আজ রোববার অক্টোবর মাসের জন্য এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করার কথা রয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)।
বৈঠকে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রোববার থেকেই এলপিজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পক্ষে কয়েকটি কোম্পানি অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি, দাম বাড়ানো হলে আমদানির ক্ষেত্রে সুবিধা হবে। এ সময় বিইআরসি তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করছে না বলেও অভিযোগ করেন লোটাবের নেতারা।
২২ সেপ্টেম্বরের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজির সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিইআরসি নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকার সিলিন্ডার কোথাও কোথাও ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জাহাজভাড়া বৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলপিজি আমদানির ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কিছু অপারেটর আগে থেকেই এলপিজি মজুত করে রেখেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি কোম্পানি আগেভাগে নিজস্ব ট্যাংকারে এলপিজি জমা করেছে। আবার কিছু জাহাজ ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি অবস্থান করছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মজুতের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ফ্রেশ এলপিজি মজুত করেনি। বরং সেপ্টেম্বরে আগের তুলনায় কম পরিমাণ এলপিজি আমদানি করা হয়েছে এবং এর তথ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নথিতেও রয়েছে। তার ভাষ্য, সরবরাহ স্বাভাবিক করতে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে আরও বেশি এলপিজি আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছে।
ওমেরা পেট্রোলিয়ামের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরীও এলপিজি মজুতের অভিযোগ নাকচ করেছেন। তার দাবি, ওমেরাসহ কয়েকটি কোম্পানি এলপিজি জমিয়ে রেখেছে—এমন খবর সঠিক নয়। বাজারের সংকট দূর করতে সরবরাহ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে দাম অতিরিক্ত বাড়লে ভোক্তারা এলপিজি ব্যবহার কমিয়ে দিতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন।
দেশে প্রতি মাসে দেড় লাখ টনের বেশি এলপিজি ব্যবহৃত হয়। এর প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে আমদানি করা হয়। প্রায় ২৯টি কোম্পানি বাজারে সক্রিয় থাকলেও মূল বাজার নিয়ন্ত্রণ করে ১২ থেকে ১৪টি প্রতিষ্ঠান।
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে আমদানির পরিমাণও প্রায় একই ছিল।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট এলপিজি সরবরাহের প্রায় ৬৮ শতাংশ আসে চারটি কোম্পানি—ওমেরা পেট্রোলিয়াম, পেট্রোমেক্স, মেঘনা ও যমুনা স্পেসটেকের কাছ থেকে। এছাড়া বিএম এনার্জি ৮ শতাংশ, ইউনাইটেড আয়গ্যাজ ৭ শতাংশ এবং ডেল্টা ৪ শতাংশ সরবরাহ করে। জেএমআই ও প্রিমিয়াম এলপিজির অংশ প্রায় ৩ শতাংশ করে।
সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি এলপিজি আমদানি করেছে ইউনাইটেড আয়গ্যাজ—প্রায় ২৩ হাজার ৫০০ টন। এরপর যমুনা স্পেসটেক প্রায় ২১ হাজার টন, বিএম এনার্জি ১৮ হাজার ২৫২ টন, ওমেরা প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ টন এবং মেঘনা গ্রুপ প্রায় ১৩ হাজার ৪০০ টন এলপিজি আমদানি করেছে।
বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনার অংশ হিসেবে ১০ থেকে ১২টি কোম্পানির কাছে সেপ্টেম্বরের প্রতিদিনের এলপিজি বিক্রির হিসাব চেয়েছে বিইআরসি। কমিশনের সচিব নজরুল ইসলাম সরকার স্বাক্ষরিত চিঠিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে রোববারের মধ্যে এসব তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে এলপিজি আমদানির ব্যয় ও মূল্য নির্ধারণের বিষয়টিও পর্যালোচনা করছে জ্বালানি বিভাগ ও বিইআরসি। এনবিআর থেকে সংগ্রহ করা আমদানি-সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে এলপিজি আমদানিতে প্রতি টনে প্রায় ১৮০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত প্রিমিয়াম খরচ হয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরামকোর ঘোষিত সিপি মূল্যও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই মূল্য বিবেচনায় নিয়েই অক্টোবরের এলপিজির নতুন দাম নির্ধারণের কাজ করছে বিইআরসি।
এসআর