সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত আটটি জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হয়েছে।
সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল চালুর পর প্রায় ১১ বছর একই বেতন কাঠামো বহাল রয়েছে।
বর্তমানে নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সরকারের আলোচনা চলছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
নতুন পে-স্কেল নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে বেতন কতটা বাড়তে পারে, সেই বিষয়টি। পাশাপাশি স্বাধীনতার পর থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোর পরিবর্তনের চিত্রও নতুন করে সামনে এসেছে।
১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পে-স্কেল চালু হয়। সে সময় ১০টি গ্রেডে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল। সর্বনিম্ন মূল বেতন ছিল ১৩০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা।
এরপর ১৯৭৭ সালের দ্বিতীয় পে-স্কেলে গ্রেডের সংখ্যা বাড়িয়ে ২১টি করা হয়। সর্বনিম্ন মূল বেতন ২২৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
১৯৮৫ সালে তৃতীয় জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হয়। তখন গ্রেড সংখ্যা কমিয়ে ২০টি করা হয়, যা এখনো বহাল রয়েছে। এই স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন বেড়ে ৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা হয়। শতাংশের হিসেবে এটিই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বেতন বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত।
১৯৯১ সালের চতুর্থ পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৯০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর ১৯৯৭ সালের পঞ্চম পে-স্কেলে এই অঙ্ক বেড়ে যথাক্রমে ১ হাজার ৫০০ ও ১৫ হাজার টাকায় পৌঁছে।
২০০৫ সালে ঘোষিত ষষ্ঠ পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২৩ হাজার টাকা। ২০০৯ সালের সপ্তম পে-স্কেলে তা বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪ হাজার ১০০ ও ৪০ হাজার টাকা।
২০১৫ সালে কার্যকর হওয়া অষ্টম জাতীয় পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল ব্যবস্থা বাতিল করে নতুন বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পদ্ধতি চালু করা হয়।
বর্তমানে প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে-স্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। বেতন কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ রয়েছে।
এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ১১ হাজার ৭৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৮২ হাজার টাকা বাড়তে পারে। তবে এটি এখনও কমিশনের সুপারিশমাত্র। সরকারের অনুমোদনের পরই চূড়ান্ত বেতন কাঠামো নির্ধারিত হবে।
বেতন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়ন করলে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার একবারে পুরো কাঠামো কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
স্বাধীনতার পর প্রথম পে-স্কেলে যেখানে সর্বনিম্ন মূল বেতন ছিল মাত্র ১৩০ টাকা, সেখানে অষ্টম পে-স্কেলে তা বেড়ে ৮ হাজার ২৫০ টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে সর্বোচ্চ মূল বেতন ২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৮ হাজার টাকা। এখন নবম পে-স্কেলে প্রস্তাবিত ২০ হাজার ও ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার বেতন কাঠামো শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেটিই দেখার অপেক্ষা।
এসআর