বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পাটের সুতা, টুইন, বস্তাসহ বিভিন্ন ধরনের পাটপণ্যের ওপর নতুন করে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে ভারত।
ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় গত ২৪ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। দেশটির ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজ (ডিজিটিআর) পরিচালিত মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনার ভিত্তিতে শুল্ক আরোপের এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা তুলনামূলক কম দামে পণ্য সরবরাহ করায় দেশটির স্থানীয় পাটশিল্প ক্ষতির মুখে পড়ছে।
নতুন শুল্ক কাঠামোয় বাংলাদেশের ৩৬টি পাট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পণ্যের ওপর আলাদা হারে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে টনপ্রতি সর্বনিম্ন শুল্ক ৫৯ ডলার। আর তালিকাভুক্ত নয়—এমন কোনো বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে পাটের সুতা বা টুইন আমদানি করা হলে প্রতি টনে সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার শুল্ক দিতে হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের ১৭টি প্রতিষ্ঠানের পাটের বস্তা রপ্তানির ক্ষেত্রে টনপ্রতি ১২০ ডলার শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আশা জুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৫৯ ডলার শুল্ক ধার্য করা হয়েছে।
তবে নতুন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শুল্কমুক্ত সুবিধাও পেয়েছে।
এএম জুট ইন্ডাস্ট্রিজ, বোনানজা জুট কম্পোজিট, লাভলী জুট মিলস, নওহাটা জুট মিলস, পোদ্দার অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ও রানু অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ—এই ছয় প্রতিষ্ঠান সব ধরনের পাটপণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। অন্যদিকে নাটোর জুট মিলস ও জনতা জুট মিলস কেবল পাটের বস্তা ও হেসিয়ান কাপড় রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করবে।
ভারতের ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন এবং এপি মেস্তা টুইন মিলস অ্যাসোসিয়েশনের আবেদনের পর গত বছরের জুনে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করে ডিজিটিআর।
বাংলাদেশ ও নেপালের পাটকলগুলোর ওপর পরিচালিত ওই তদন্তে বাংলাদেশের ৫৪টি মিলের কাছে তথ্য চাওয়া হয়। এর মধ্যে ৩৮টি প্রতিষ্ঠান তথ্য সরবরাহ করে।
ডিজিটিআরের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকালীন সময়ে ভারতে পাটপণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ২০ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি কমেছে ১৩ শতাংশ।
তবে রপ্তানি তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশি পাটপণ্যের রপ্তানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ কমে ১ লাখ ১৭ হাজার টনে নেমে আসে।
ভারতের নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) চেয়ারম্যান তাপস প্রামাণিক।
তাঁর মতে, বাংলাদেশের রপ্তানির ক্ষেত্রে ভর্তুকির যে হার ভারত বিবেচনায় নিয়েছে, সেটি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাপস প্রামাণিক বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার পাটের সুতা, টুইন ও বস্তা রপ্তানিতে ৩ থেকে ৫ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে। কয়েক বছর আগের তুলনায় এ হারও অনেক কম।
তাঁর ভাষায়, ভারতের বাজারে সাময়িকভাবে রপ্তানি কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাকৃতিক আঁশের তৈরি পণ্যের চাহিদা থাকায় সামগ্রিক রপ্তানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা নেই।
এর আগে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে পাটের সুতা, টুইন, হেসিয়ান কাপড় ও বস্তা আমদানির ক্ষেত্রে টনপ্রতি ১৯ থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছিল ভারত।
পরে এই শুল্ক পাটের বস্তার কাপড়ের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণ করা হয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি করে ১১৬ কোটি ডলার আয় করেছিল।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই আয় কমে ৮২ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি আয় ৮ শতাংশ বেড়ে ৮৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে।
নতুন শুল্ক ব্যবস্থার কারণে ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পাটপণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
এসআর