[email protected] শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
২১ কার্তিক ১৪৩৩

অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্রে সিসার ঝুঁকি, খাবারেও মিলছে বিষাক্ত ধাতু

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৫ নভেম্বর ২০২৬ ৭:৪৯ পিএম

সংগৃহীত ছবি

দেশে তৈরি কিছু অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার করে রান্না করলে খাবারের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করতে পারে বিষাক্ত ধাতু সিসা।

 বিশেষ করে নতুন পাত্রে রান্নার প্রথম কয়েকবার খাবারে সিসার উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

 

বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গবেষণার ফলাফল জানানো হয়। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি’-তে প্রকাশিত হয়েছে।

 

গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অনেক অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র পুরোনো ও ব্যবহৃত ধাতু গলিয়ে তৈরি করা হয়। এসব কাঁচামালের মান যথাযথভাবে পরীক্ষা না করায় সিসার মতো ক্ষতিকর উপাদান পাত্রে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

গবেষকেরা বিভিন্ন পরিবারের ব্যবহৃত সাতটি পুরোনো পাত্র এবং বাজার থেকে কেনা ২০টি নতুন পাত্র পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, সব পাত্র থেকেই রান্না করা খাবারে সিসা মিশেছে।

 

নতুন পাত্রে প্রথমবার রান্না করা প্রতি কেজি সাদা ভাতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে। অথচ শিশুদের খাবারে সিসার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) নির্ধারিত সীমা প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম। কয়েকবার ব্যবহারের পর সিসার পরিমাণ কমলেও তা নিরাপদ সীমার নিচে আসেনি।

 

গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, এসব পাত্রে রান্না করা ভাত খাওয়ার মাধ্যমে গ্রামীণ একটি শিশু দৈনিক গ্রহণের ক্ষেত্রে এফডিএর নির্ধারিত সীমার পাঁচ গুণের বেশি সিসার সংস্পর্শে আসতে পারে।

 

পরিষ্কারের পদ্ধতিতেও বাড়তে পারে সিসার মাত্রা

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, নতুন অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র স্টিলের তারযুক্ত মাজুনি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে সিসা নির্গমনের পরিমাণ প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া ধাতব খুন্তি ব্যবহার এবং টক বা অম্লীয় খাবার রান্নার সময়ও খাবারে সিসা মেশার আশঙ্কা বাড়ে।

 

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রজেক্ট আনলেডেড’-এর পরিচালক ড. জেনা ফরসিথ জানান, সিসার কোনো দৃশ্যমান রং, গন্ধ কিংবা স্বাদ নেই। ফলে চকচকে ও দেখতে ভালো পাত্র থেকেও খাবারে এই বিষাক্ত ধাতু মিশতে পারে। শুধু বাহ্যিক অবস্থা দেখে কোনো পাত্র নিরাপদ কি না, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

 

আইসিডিডিআর,বির সহকারী বিজ্ঞানী ড. জেসমিন সুলতানা বলেন, পরিবারের সদস্যদের জন্য যত্ন নিয়ে রান্না করা খাবার থেকেও যদি পাত্রের কারণে সিসা শরীরে প্রবেশ করে, তাহলে তা উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে শিশুদের খাবার তৈরিতে পরীক্ষিত ও নিরাপদ রান্নার পাত্র ব্যবহারের গুরুত্ব রয়েছে।

 

নিরাপদ পাত্র নিশ্চিত করতে নীতিমালা চায় গবেষক দল

গবেষকদের মতে, এই সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব শুধু সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। রান্নার পাত্র উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে কার্যকর নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

আইসিডিডিআর,বির প্রকল্প সমন্বয়ক ড. মো. মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) প্রতি রান্নার পাত্র থেকে খাবারে সিসা মেশার বিষয়ে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা মান প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনকে (বিএসটিআই) এ ধরনের পণ্যের জন্য সিসা-সংক্রান্ত মান নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

 

তার মতে, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত তদারকি বাড়ানো গেলে সাধারণ পরিবারকে এই স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।

 

গবেষকেরা জানিয়েছেন, সীমিতসংখ্যক পাত্র নিয়ে পরীক্ষাগারে এই গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। তাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রান্নার পাত্র, উৎপাদনপ্রক্রিয়া ও মানুষের দৈনন্দিন রান্নার অভ্যাস বিবেচনায় নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিং সেন্টার অন গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের সহযোগিতায় গবেষণাটি সম্পন্ন হয়।

এফ/ডি

সম্পর্কিত খবর