স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন রুরাল অ্যান্ড আরবান ট্রান্সপোর্টেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (RUTDP)-এর সাবেক প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী মো. মঞ্জুর আলীর
বিরুদ্ধে আউটসোর্সিং নিয়োগ, কনসালটেন্ট ফার্ম অন্তর্ভুক্তি এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যেই অবসরে যাওয়া এই কর্মকর্তার পুনরায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট মহলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকৌশলী মঞ্জুর আলীর পিআরএল (অবসর-উত্তর ছুটি) শুরু হয়েছে ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে। সম্প্রতি তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের একটি প্রস্তাব স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের দপ্তরে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, পিআরএলে যাওয়ার ঠিক আগে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ২৫০ জন কর্মী নিয়োগে ব্যাপক আর্থিক লেনদেন হয়েছে। সহকারী প্রকৌশলী পদে ১০ লাখ টাকা, উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে ৮ লাখ টাকা এবং কার্যসহকারী, সোসিওলজিস্ট ও হিসাব সহকারী পদে ৫ লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীদের একাংশের দাবি, তার ভাই মো. রাজুর মাধ্যমে এসব অর্থ লেনদেন হয়েছে এবং অনেকেই টাকা দিয়েও চাকরি পাননি।
এছাড়া আরইউটিডিপি প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী কনসালটেন্ট খাতে বরাদ্দকৃত ৩৭০ কোটি টাকার ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০ শতাংশ কমিশন বা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ইফতিশা, অ্যাকুয়া কনসালটেন্সি, ডেপকো এবং ডিপিএম নামের চারটি ফার্মকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
নিয়মানুযায়ী সিভিতে অন্তর্ভুক্ত জনবল নিয়োগের পরিবর্তে প্রকল্প পরিচালক নিজের পছন্দমতো ৮৭ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট মিউনিসিপ্যাল ইঞ্জিনিয়ার (এএমই)সহ বিভিন্ন পদে জনবল নিয়োগ দেন। এসব নিয়োগে জনপ্রতি ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে মাসিক ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা বেতনের ইন্ডিভিজুয়াল কনসালটেন্ট পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া কিছু পদে জনবল নিয়োগ না দিয়েও ভুয়া হাজিরা দেখিয়ে বেতনের বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি প্রকল্প বহির্ভূত ব্যক্তিগত কর্মচারীদের প্রকল্পভুক্ত দেখিয়ে বেতন উত্তোলনের বিষয়টিও দুদকের অনুসন্ধানে রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, আরইউটিডিপি প্রকল্পে যোগদানের আগে মঞ্জুর আলী এমজিএসপি (MGSP) প্রকল্পে ডেপুটি প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই প্রকল্প সমাপ্তির পর উদ্বৃত্ত প্রায় ২০ কোটি টাকা নতুন প্রকল্পে ব্যয় না করে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে রাজধানীর ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় চারটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, মধুমতি মডেল টাউনে একটি প্লট এবং বিরুলিয়ায় কয়েক একর জমি ক্রয় করেছেন মঞ্জুর আলী। এছাড়া তার ভাই প্রকৌশলী রাজুর নামেও একাধিক ফ্ল্যাট থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবেক এই প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে বর্তমানে এলজিইডির কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, গুরুতর অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান থাকা অবস্থায় তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলে তা মন্ত্রণালয় ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের উপ-পরিচালক আজিজুল হক বলেন, “অভিযোগের বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তাদের সম্পদের তথ্য যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।এছাড়া আউটসোর্সিং ও কনসালটেন্সি নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে বিজ্ঞাপন, নিয়োগ বিধিমালা ও সংশ্লিষ্ট সব নথিপত্র এলজিইডির কাছে চাওয়া হয়েছে। বিষয়টি দুদক অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করছে।”
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. মঞ্জুর আলী প্রতিদিনের বাংলাকে বলেন, আমি কোন দুর্নীতি করিনি। আমি বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের সাথে কোন আপষ করিনি। আমি জাতীয়তাবাদের আদর্শের লোক বলে আমাকে নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন তিনি।
এসআর