গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ।
★ এইচএসসিতে পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ
★ পাসের হারে এগিয়ে মেয়েরা, জিপিএ-৫ বেশি ছেলেদের
★ শূন্য পাস ২৯৩ প্রতিষ্ঠানে
★ বিজ্ঞানে ভালো, মানবিকে সবচেয়ে খারাপ ফল২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।
গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ ।
বিষয়ভিত্তিক ফলাফলে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে।
বিভাগভিত্তিক ফলে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে মানবিক বিভাগ।
অন্যদিকে সামগ্রিকভাবে পাসের হারে ছাত্রীরা এগিয়ে থাকলেও জিপিএ-৫ অর্জনে এগিয়ে রয়েছেন ছাত্ররা।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন আলিম পরীক্ষাতেও একই চিত্র দেখা গেছে।
গতকাল শনিবার সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।
ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
প্রকাশিত ফল অনুযায়ী,এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন।
এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেন ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন। উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।
এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন।
গত বছর পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সে হিসাবে এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট। গত ২২ বছরের মধ্যে এবার পাসের হার সর্বনিম্ন।
ইংরেজি ও আইসিটিতে ফেল বেশি:
বিষয়ভিত্তিক ফলাফলে ইংরেজিতে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। এ বিষয়ে ফেল করেছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আইসিটি। এ বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। দুই বিষয়ে মোট ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন।
বিজ্ঞানে ভালো, মানবিকে সবচেয়ে খারাপ ফল:
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের বিভাগভিত্তিক ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে ভালো করেছেন। এ বিভাগে পাসের হার ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ।
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৫০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অন্যদিকে মানবিক বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ।
মানবিক বিভাগে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৯৩২ জন ছাত্র পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ৯০ হাজার ৬৬৪ জন।
অন্যদিকে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮০৩ জন ছাত্রীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৪৭ জন।
সব মিলিয়ে এ বিভাগে ৬ লাখ ৭ হাজার ৭৩৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩১১ জন।
অকৃতকার্য হয়েছেন ৩ লাখ ৫১ হাজার ৪২৪ জন।
পাসের হারে এগিয়ে ছাত্রীরা, জিপিএ-৫-এ ছাত্ররা :
সামগ্রিক ফলাফলে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা ভালো করেছেন।
এবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৬ লাখ ৭ হাজার ৬৪৯ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছেন ২ লাখ ৯০ হাজার ১৫৭ জন। তাদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
অন্যদিকে ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৯ জন ছাত্রীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫২৮ জন।
তাদের পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে ছাত্রদের চেয়ে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছেন ছাত্রীরা।
তবে জিপিএ-৫ অর্জনে ছাত্ররা এগিয়ে।
এবার ২০ হাজার ৩৬৩ জন ছাত্র এবং ১৯ হাজার ৭২১ জন ছাত্রী সর্বোচ্চ এই ফল পেয়েছেন। অর্থাৎ জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে ছাত্রদের সংখ্যা ৬৪২ জন বেশি।
সাধারণ বোর্ডে পাসের হার ৫১.৬২ শতাংশ:
দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। এসব বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন শিক্ষার্থী।
অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষায় পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ।
এ পরীক্ষায় ৮৯ হাজার ৩২১ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৫৪ হাজার ৫৪৭ জন। তাদের মধ্যে ২৯ হাজার ২৬৯ জন ছাত্র এবং ২৫ হাজার ২৭৮ জন ছাত্রী।
আলিমে পাসের হারে ছাত্রীরা, জিপিএ-৫-এ ছাত্ররা এগিয়ে:
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন আলিম পরীক্ষায় পাসের হারে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছেন। তবে জিপিএ-৫ অর্জনে এগিয়ে আছেন ছাত্ররা।
প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, আলিম পরীক্ষায় ছাত্রীদের পাসের হার ৬৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। অন্যদিকে ছাত্রদের পাসের হার ৫৮ দশমিক ১০ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে ছাত্রদের চেয়ে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছেন ছাত্রীরা।
এবার আলিম পরীক্ষায় মোট ৮৯ হাজার ৩২১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ছিলেন ৫০ হাজার ৩৭৪ জন এবং ছাত্রী ৩৮ হাজার ৯৪৭ জন। উত্তীর্ণ ছাত্রের সংখ্যা ২৯ হাজার ২৬৯ এবং ছাত্রীর সংখ্যা ২৫ হাজার ২৭৮ জন।
জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।
এ বছর ২ হাজার ২৮ জন ছাত্র এবং ১ হাজার ২২২ জন ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। সব মিলিয়ে আলিমে সর্বোচ্চ ফল অর্জন করেছেন ৩ হাজার ২৫০ জন। জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্ররা ছাত্রীদের চেয়ে ৮০৬ জন এগিয়ে রয়েছেন।
কারিগরি বোর্ডে পাসের হার ৪৯.৪৩ শতাংশ:
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি (বিএম/বিএমটি), এইচএসসি ভোকেশনাল ও এইচএসসি ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষায় পাসের হার ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
এ বোর্ডে ১ লাখ ২ হাজার ৯৪৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৫০ হাজার ৮৮৯ জন।
পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ৩৩ হাজার ৯৯ জন এবং ছাত্রী ১৭ হাজার ৭৯০ জন। এ বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৮৮৬ জন। তাঁদের মধ্যে ১৮০ জন ছাত্র এবং ৭০৬ জন ছাত্রী।
বিদেশের কেন্দ্রে পাসের হার ৯০.৮৭ শতাংশ:
এবার বিদেশের আটটি কেন্দ্রে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেন ২৩০ জন শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন ২০৯ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছেন ২১ জন। সে হিসাবে বিদেশের কেন্দ্রগুলোতে পাসের হার ৯০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হয়েছেন।
শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ৯১টি:
এবার দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২টি।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি।
অন্যদিকে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩৯টিতে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫টি। সে হিসাবে এক বছরে শতভাগ পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ২০৬টি।
এদিকে উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আগামী ১ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত আবেদন করা যাবে। আবেদন পাওয়ার পর খাতা পুনর্নিরীক্ষণ করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, গত বছর প্রায় ১৩ লাখ উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়েছিল।
যাচাই-বাছাইয়ের পর ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছিল।
প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী অকৃতকার্য থেকে উত্তীর্ণ হন এবং ৩ হাজার ৭৯ জন নতুন করে জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং মূল্যায়নে গুরুতর ভুলের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও কাজ চলছে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।
এ/এইচ/টি