[email protected] বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
২০ কার্তিক ১৪৩৩

২০৫১ সালের মধ্যে প্রবীণনির্ভর অর্থনীতির দিকে যাবে বাংলাদেশ: বিশ্বব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ নভেম্বর ২০২৬ ৫:৩২ পিএম

দক্ষিণ এশিয়ায় বর্তমানে প্রায় ১১৭ কোটি কর্মক্ষম মানুষের উপস্থিতি অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

 তবে সময়মতো কর্মসংস্থান বাড়ানো, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং উৎপাদনশীলতা উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হবে। এমনকি তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনীতির সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।

 

সংস্থাটির নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশে ২০৪৯ সালের মধ্যে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ সময়সীমা ২০৫১ সাল। ফলে অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য কিছুটা বাড়তি সময় পেলেও এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

 

মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় থেকে ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

 

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে। ২০৪৯ সালের মধ্যে এ অঞ্চলে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের হার ১৪ শতাংশে উন্নীত হবে। তখন অঞ্চলটি প্রবীণনির্ভর অর্থনীতির পর্যায়ে প্রবেশ করবে। বাংলাদেশে একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে ২০৫১ সালে।

 

বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ায় জনসংখ্যার বার্ধক্য আসছে দ্রুতগতিতে। আরও উদ্বেগের বিষয়, মাথাপিছু আয় তুলনামূলক কম থাকতেই দেশগুলোকে এ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

 

সংস্থাটির হিসাব বলছে, ২০০০ সাল থেকে কর্মক্ষম বয়সী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ এশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রতিবছর গড়ে ০.৪ শতাংশ এবং শ্রম উৎপাদনশীলতা ১.১ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু ২০৫০ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধিতে জনসংখ্যার এই অবদান কমে বার্ষিক মাত্র ০.১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।

 

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে যাওয়ার সময়ই দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলো তুলনামূলক কম বয়সে বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর নীতি গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে বেশি সংখ্যায় মানসম্মত চাকরি নিশ্চিত করার মাধ্যমে তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের বার্ধক্যজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হবে।

 

বাংলাদেশের কর্মসংস্থানে বড় চ্যালেঞ্জ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের অনুকূল বয়সকাঠামো থাকলেও সেই সুবিধা পুরোপুরি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি। পর্যাপ্ত আনুষ্ঠানিক চাকরির অভাব, শ্রমবাজারে নারীদের সীমিত অংশগ্রহণ এবং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি এর অন্যতম কারণ।

 

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যা মোট কর্মীর প্রায় ৮৪ শতাংশ। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদের মধ্যেও ৪৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক খাতে নতুন চাকরি তৈরির গতি তুলনামূলক ধীর। সম্প্রতি ছোট আকারের অনেক প্রতিষ্ঠানও কর্মী কমাতে বাধ্য হয়েছে।

 

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জাঁ পেসম বলেন, বাংলাদেশের জনমিতিক সুবিধা কতটা কাজে লাগবে, তা নির্ভর করছে এখন নেওয়া পদক্ষেপের ওপর। মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহযোগিতা, তরুণদের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা এবং নারীদের চাকরির পথে থাকা বাধা দূর করা জরুরি। পাশাপাশি প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা ও বৃদ্ধ বয়সে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও নিতে হবে।

 

চাকরির সুযোগ না বাড়লে বাড়বে উদ্বেগ

প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য পর্যাপ্ত চাকরি তৈরি করা না গেলে জনমিতিক সুবিধা অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। এটিই বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা।

 

পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তাঁরা বলেন, শুধু তরুণ জনগোষ্ঠী থাকা কিংবা তাদের শিক্ষিত করে তোলাই যথেষ্ট নয়। সরকারি চাকরির সুযোগ সীমিত হওয়ায় কর্মসংস্থান তৈরিতে বেসরকারি খাতকে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। এজন্য ব্যবসা ও বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

অনানুষ্ঠানিক খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিষয়ে কর্মকর্তারা বলেন, কেবল আইন ও বিধিনিষেধ আরোপ করে এ খাতকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় নিয়ে আসা সম্ভব নয়। বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়, প্রয়োজনীয় প্রণোদনা এবং বিদ্যমান বাধা দূর করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে এ পরিবর্তন আনতে হবে।

 

উর্বরতার হার কমে যাওয়ার বিষয়েও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, একবার জন্মহার কমতে শুরু করলে তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন। আর্থিক সহায়তা বা বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে জন্মহার বাড়ানোর উদ্যোগও বিভিন্ন দেশে প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।

 

বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণ ও অর্থায়ন সহজ করা এবং ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সরল করার সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কারিগরি দক্ষতার মান বাড়িয়ে তরুণদের কর্মবাজারের উপযোগী করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

এ ছাড়া প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তায় উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং কার্যকর পেনশনব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

 

প্রতিবেদনে এই উদ্যোগগুলোকে ‘দ্বিতীয় জনমিতিক লভ্যাংশ’ অর্জনের সুযোগ হিসেবে দেখা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ও সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি তাঁদের সঞ্চয় ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণও বাড়ানো সম্ভব।

এফ/ডি

সম্পর্কিত খবর