[email protected] বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
২০ কার্তিক ১৪৩৩

২০২৯ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ জিডিপির ১০০ শতাংশ ছোঁয়ার আশঙ্কা: আইএমএফের কড়া বার্তা

সাইদুর রহমান

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ৭:৪৭ এএম

সংগৃহীত ছবি

বিশ্বজুড়ে সরকারি ঋণের মাত্রা অভূতপূর্ব হারে বাড়ছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৯

 সালের মধ্যেই বিশ্বের মোট সরকারি ঋণ বৈশ্বিক জিডিপির ১০০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় প্রকাশিত ‘ফিসকাল মনিটর’ প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বৈশ্বিক আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব, বাজেট ঘাটতি এবং সুদের হার বৃদ্ধির প্রভাবে আইএমএফ সরকারগুলোকে জরুরিভিত্তিতে কার্যকর আর্থিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

​আইএমএফের মূল পর্যবেক্ষণ ও উদ্বেগ

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালেই বৈশ্বিক সরকারি ঋণ জিডিপির ৯৪ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছিল। আইএমএফের রাজস্ববিষয়ক বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস জানান, আর্থিক ঝুঁকি বাড়লেও দেশগুলোর পক্ষ থেকে তা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ও সময়োপযোগী উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

​বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতিতে প্রতিরক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং কৌশলগত স্বনির্ভরতার পেছনে সরকারি ব্যয় লাফিয়ে বাড়ছে। পাশাপাশি ঋণের চড়া সুদ মেটাতে গিয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতের বরাদ্দ কমে যাওয়ার মতো ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেলে তা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে, যা সুদহারকে দীর্ঘ সময় উঁচুতে ধরে রাখবে।

​ক্ষতির মুখে নিম্ন আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশগুলো

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানিয়েছেন, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে সংগৃহীত মোট রাজস্বের ১৪ শতাংশই চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে, যা এক দশক আগে ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। উন্নত বিশ্বেও সুদের হার বেশি থাকায় বিনিয়োগকারীরা উদীয়মান বাজার থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন। ফলে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থায়ন করা কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ইউএনডিপির প্রশাসক আলেক্সান্ডার ডে ক্রু উল্লেখ করেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উন্নত বিশ্বের তুলনায় গড়ে প্রায় তিনগুণ বেশি সুদ গুণতে হচ্ছে।

​এই সংকট কাটাতে আইএমএফের পক্ষ থেকে ‘দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা ট্রাস্ট’ (পিআরজিটি) এবং ‘দুর্যোগকালীন ঋণ-স্বস্তি তহবিল’ (সিসিআরটি)-এর মতো কাঠামোর আওতায় স্বল্পসুদে ঋণ ও সুবিধা নিশ্চিত করার জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

​যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকেও নীতি পরিবর্তনের পরামর্শ

বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান ঋণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তিনি স্পষ্ট জানান, কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর ভরসা করে ঋণ সংকট কাটানো সম্ভব নয়; বরং বাজেট ঘাটতি সরাসরি কমাতে হবে। একই সাথে চীনকে রপ্তানিভিত্তিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বড় দেশগুলোর এসব নীতি পুরো বিশ্বের অর্থবাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।

​উত্তরণের উপায়: কর ও ব্যয় সংস্কার

আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী, কেবল নতুন কর আরোপ নয়, বরং করব্যবস্থার ফাঁকফোকর বন্ধ ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব। ভ্যাট ও করপোরেট করের জটিলতা দূর করা, অপ্রয়োজনীয় আর্থিক ছাড় পর্যালোচনা এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপচয় রোধ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

​বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় দিক

বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ও বিশ্বব্যাংকের ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশ্বব্যাপী ঋণের ব্যয় বাড়তে থাকায় দেশের অভ্যন্তরে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ টানা এবং বৈদেশিক ঋণ ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা বাংলাদেশসহ উদীয়মান অর্থনৈতিক দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এসআর

সম্পর্কিত খবর