[email protected] শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
২১ কার্তিক ১৪৩৩

অভিজাত গুলশান-বনানীতে স্যুয়ারেজ সংকট: সেপটিক ট্যাংকহীন ভবনের বর্জ্যে দূষিত লেক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০২৬ ৯:০০ এএম

সংগৃহীত ছবি

রাজধানীর সর্বাধুনিক ও পরিকল্পিত এলাকা গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনের

 চাকচিক্যের আড়ালে প্রকট হয়ে উঠেছে পয়োনিষ্কাশনের সংকট। এসব বিত্তবান এলাকার অধিকাংশ ভবনে নির্দিষ্ট সেপটিক ট্যাংক না থাকায় পয়োবর্জ্য সরাসরি গিয়ে পড়ছে আশপাশের লেক ও খালের পানিতে। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে কয়েক শত কোটি টাকা খরচের পরও দূষণমুক্ত করা সম্ভব হয়নি গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক।

​৬৪ শতাংশ ভবনেই নেই সেপটিক ট্যাংক

​রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) যৌথ প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ১০টি বিশেষ টিমের মাধ্যমে ওই অঞ্চলের ৪,৪০৯টি ভবন পরিদর্শনের পর তৈরি করা প্রতিবেদনে দেখা যায়:

​সেপটিক ট্যাংকের অনুপস্থিতি: পরিদর্শনের আওতায় থাকা ৬৪ শতাংশ অর্থাৎ ২,৮২২টি ভবনে কোনো সেপটিক ট্যাংক নেই। মাত্র ১,৫৪০টি ভবনে এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

​সোকওয়েল বা শোষক কূপ: ৯২.২৭ শতাংশ (৪,০৬৮টি) ভবনে কোনো শোষক কূপের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। মাত্র ২৯৪টি ভবনে এই সুবিধা রয়েছে।

​১৬ বছর ও ৫৫০ কোটি টাকার প্রকল্পেও মেলেনি সুফল

​গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক দূষণমুক্ত করার উদ্দেশ্যে ২০১০ সালের জুলাইয়ে ৪১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা বাজেটে তিন বছর মেয়াদী প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। বারবার মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গড়ানো হয়েছে এবং সংশোধন করে বাজেট ধরা হয়েছে ৫৫০ কোটি টাকা।

​পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী:

​প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ লেকের মধ্যে মাত্র আড়াই কিলোমিটার অংশ থেকে ক্ষতিকর স্লাজ ও বর্জ্য অপসারণ করা গেছে।

​লেকের অন্তত সাতটি স্থানে সরাসরি স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ লাইনের সংযোগ রয়েছে।

​ঢাকা ওয়াসা ও রাজউকের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং আগের পরিকল্পনাগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন না হওয়ায় সমস্যাটি স্থায়ী রূপ নিয়েছে।

​আইন লঙ্ঘন ও বিষে ভরা পরিবেশ

​বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় স্যুয়ারেজ লাইন না থাকলে প্রতিটি ভবনে নিজস্ব সেপটিক ট্যাংক বা শোষক কূপ থাকা বাধ্যতামূলক। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির ঘাটতির কারণেই এই সংকট দেখা দিয়েছে।

​জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান জানান, পরিকল্পিত এলাকায় সেপটিক ট্যাংক না থাকা গুরুতর পরিবেশগত অপরাধ। তিনি ব্যর্থ ভবনমালিকদের বিরুদ্ধে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্নসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপর তাগিদ দেন।

​গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের: একটি বিশিষ্ট এলাকার লেকের পরিবেশ রক্ষা করতে না পারলে তা পুরো দেশের জন্য হতাশাজনক। এলাকাটির ৭০-৮০ শতাংশ ভবনেই নিয়ম মেনে সেপটিক ট্যাংক বা সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) বসানো হয়নি।

​রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম: পরিবেশ সুরক্ষায় প্রতিটি ভবনে সেপটিক ট্যাংক ও এসটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে ইতোমধ্যে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।

​স্থানীয় বাসিন্দারা: নিয়ম মেনে সেপটিক ট্যাংক তৈরি করা ভবন মালিকদের দাবি, যারা আইন মানছে না তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে লেকের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক।

এসআর

সম্পর্কিত খবর