ভালো চাকরি, আকর্ষণীয় বেতন কিংবা সামাজিক মর্যাদা—ক্যারিয়ারে এমন অনেক সুযোগই পেয়েছিলেন নায়লা শারাফ।
নায়লা এখন নেত্রকোনা সদর উপজেলার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। প্রায় সাত বছর ধরে তিনি সেখানে শিশুদের পড়াচ্ছেন। বিশেষ করে প্রান্তিক পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি এবং তাদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাকেই নিজের জীবনের অন্যতম সার্থকতা মনে করেন তিনি।
নায়লার শিক্ষাজীবন শুরু ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। এরপর বুয়েট থেকে প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। তবে কর্মপরিবেশ এবং কিছু অনিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে অল্প সময়ের মধ্যেই সেই চাকরি ছেড়ে দেন।
এরপর জনতা ব্যাংকে এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু ব্যাংকের নিয়মিত ও যান্ত্রিক কর্মজীবনও তাকে দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারেনি। পরবর্তীতে ৩৪তম বিসিএসে সফল হলেও ক্যাডার চাকরিতে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শেষ পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকেই নিজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত পেশা হিসেবে বেছে নেন।
কেন এমন সিদ্ধান্ত—জানতে চাইলে নায়লা জানান, অর্থ কিংবা খ্যাতির পেছনে ছুটে জীবন কাটানোর আগ্রহ তার নেই। সাধারণ জীবনযাপন এবং মানসিক প্রশান্তিকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।
তার শিক্ষকতা কেবল পাঠ্যবই পড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের সত্যবাদী, সাহসী ও দায়িত্বশীল করে গড়ে তুলতে নিয়মিত চেষ্টা করেন তিনি। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করার অভ্যাসও শিশুদের মধ্যে তৈরি করতে চান।
শিক্ষার্থীদের কাছে পড়াশোনাকে আরও আনন্দদায়ক করে তুলতে শ্রেণিকক্ষের বাইরেও সময় দেন নায়লা। নিজে ছবি আঁকার পাশাপাশি ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী তৈরি করেন। শিক্ষার্থীদের উপযোগী বিভিন্ন কনটেন্ট ও উপকরণ তৈরির মাধ্যমে পাঠদানকে সহজ করার চেষ্টা থাকে তার।
তার এমন সিদ্ধান্ত শুরুতে অনেক আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। তবে নিজের পথ বেছে নেওয়ার বিষয়ে কোনো অনুশোচনা নেই নায়লার। শৈশবে তিনি যে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন, প্রান্তিক পরিবারের শিশুরাও যেন তেমন সুযোগ পায়—এটাই তার বড় প্রত্যাশা।
নায়লার মতে, অন্য কোনো পেশায় থাকলে হয়তো অর্থ ও সামাজিক পরিচিতি বেশি অর্জন করা সম্ভব হতো। কিন্তু শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পাওয়া যায়, সেটিকেই তিনি সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করেন।
মেধাবী তরুণদের প্রাথমিক শিক্ষায় আসার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, বিনিময়ে বড় কোনো প্রত্যাশা না রেখে শিশুদের জন্য কাজ করার মানসিকতা থাকলেই এই পেশায় আসা উচিত। বিশ্বজুড়ে প্রাথমিক শিক্ষকতা সম্মানজনক পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়; বাংলাদেশেও মেধাবী ও আন্তরিক তরুণেরা এগিয়ে এলে এ পেশার মর্যাদা আরও বাড়ানো সম্ভব।
পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লীলা রানী ভৌমিক বলেন, বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেও নায়লা যেভাবে প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের আপন সন্তানের মতো যত্ন নিয়ে পড়াচ্ছেন, তা সত্যিই ব্যতিক্রমী। তার মতো শিক্ষক বিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।
এসআর