[email protected] সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬
২৯ পৌষ ১৪৩২

আঁধার জয়ী প্রেম, হার মানলো অন্ধত্ব

বাবলু দেব, কুবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৬ জানুয়ারি ২০২৬ ৭:৫৬ পিএম

সংগৃহীত ছবি

ম্যাজিক প্যারাডাইস -রঙিন আলোয় মোড়া এক পৃথিবী।

হাসির শব্দ, মানুষের কোলাহল, ভিড়ের উচ্ছ্বাসে ভরে আছে চারপাশ। ঠিক এই উচ্ছ্বাসের মাঝেই এক কোণে বসে ছিলেন দু’জন মানুষ—স্বামী ও স্ত্রী। অনেকের চোখ এড়িয়ে গেলেও, মুহূর্তেই আমার দৃষ্টি আটকে গেল তাদের দিকে। কারণ, তারা ছিলেন নীরব; অথচ সেই নীরবতার গভীরতা ছিল অসীম।

লোকটির মাথায় সাদা টুপি, গায়ে সাদামাটা পোশাক, চাদরে মোড়া শরীর। পাশে বসা নারীটির মাথায় রঙিন কাপড়, কিন্তু চোখ দু’টি অন্ধকারে নিমজ্জিত—তিনি দৃষ্টিহীন। তারা ভিক্ষা করছিলেন, ভ্রমণপিপাসু মানুষের দিকে হাত বাড়াচ্ছিলেন। তবে সেই হাত বাড়ানোর ভেতর কোনো অভিযোগ ছিল না; ছিল কেবল বেঁচে থাকার বিনয়।

আমার এক ছোট ভাই অনুমতি না নিয়েই তাদের একটি ছবি তুলে ফেলল। ছবি দেখানোর পর লোকটি মৃদু হেসে বললেন,
“অনেক সুন্দর হয়েছে। আমাদের অনেক সুন্দর লাগছে।”
ঠিক তখনই সেই দৃষ্টিহীন নারীটি, যিনি ছবিটি দেখতে পান না, খুব স্বাভাবিক অথচ ভারী কণ্ঠে বললেন-
“আমি তো কালো। আমাকে কেমন দেখাচ্ছে?”
এই একটি প্রশ্নে যেন জমে ছিল শত বছরের ক্ষত—দারিদ্র্য, অবহেলা আর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া সৌন্দর্যের সংজ্ঞা। তিনি নিজেকে দেখেন অন্যের চোখে, সমাজের শেখানো আয়নায়। লোকটি এক মুহূর্তও না ভেবে, একচুল পরিবর্তন না করে আবারও বললেন—
“অনেক সুন্দর।”
সেই মুহূর্তে বুঝলাম—সৌন্দর্য কখনো চোখে ধরা পড়ে না, সৌন্দর্য বিশ্বাসে বাস করে।
তারা গ্রাম থেকে এসেছেন। জীবন শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবে—ক্ষেতে কাজ, ঘরের কাজ, সন্তানদের স্বপ্ন। একসময় রোগে নারীর চোখের আলো নিভে যায়। তখন যেন পৃথিবীও ধীরে ধীরে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কাজ কমে যায়, সুযোগ সংকুচিত হয়। ‘ভিক্ষা’ শব্দটি তারা বেছে নেননি; পরিস্থিতিই তাদের এই জায়গায় এনে বসিয়েছে।

লোকটি শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“আমি ওর চোখ হয়ে চলি। ও হাত ধরলে পথ পাই।”
নারীটি হেসে যোগ করলেন,
“উনি কথা বললে আমি পৃথিবী দেখি।


ভিক্ষার পাত্রে পড়া কয়েনের শব্দ দিয়েই তারা দিনের হিসাব মেলান। কোনো দিন বেশি পড়ে, কোনো দিন কম। তবু লোকটি প্রতিদিন স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন—
“ভালো আছো?”
আর উত্তর আসে—
“তুমি পাশে থাকলে ভালোই আছি।


“আমি তো কালো”—এই বাক্যটি কেবল একটি প্রশ্ন নয়, এটি আমাদের সমাজের আয়না। যেখানে গায়ের রঙকে সৌন্দর্যের মাপকাঠি বানানো হয়, সেখানে দৃষ্টিহীন এক নারীও নিজেকে বিচার করেন সেই মানদণ্ডে। অথচ যিনি তাকে ভালোবাসেন, তিনি জানেন—ভালোবাসার চোখে কোনো রঙ নেই।

লোকটির “অনেক সুন্দর”—এই দুই শব্দে ছিল আশ্রয়, ছিল সম্মান, ছিল অটল বিশ্বাস। যেন তিনি বলছিলেন—তোমার মূল্য অন্যের দৃষ্টিতে নয়, আমার ভালোবাসাই যথেষ্ট।


ম্যাজিক প্যারাডাইসের আলো ঝলমলে মুহূর্ত শেষে মানুষ বাড়ি ফিরে যায়। কিন্তু তারা থেকে যান—একই বেঞ্চে, একই প্রত্যাশায়। আমরা ছবি তুলি, গল্প বলি, আবেগে ভিজি। প্রশ্ন হলো—এই আবেগ কি সহানুভূতিতে রূপ নেয়?


‘ভিক্ষুক’ শব্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষগুলোকে দেখার চোখ কি আমাদের আছে? আমরা কি তাদের শুধু ‘সহায়তা’ নয়, ‘সম্মান’ দিতে পারি?

সেদিন আমরা একটি ছবি তুলেছিলাম। কিন্তু তার চেয়েও বড় কিছু সঙ্গে নিয়ে ফিরেছি—দেখার বাইরের সৌন্দর্যের একটি পাঠ।
যেখানে অন্ধ এক নারী নিজেকে প্রশ্ন করে, আর একজন মানুষ বারবার একই উত্তর দিয়ে যান—
“অনেক সুন্দর।”
হয়তো পৃথিবী একদিনে বদলায় না।
কিন্তু এমন উত্তরগুলোই পৃথিবীকে একটু একটু করে আরও মানবিক করে তোলে।

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর