গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও তথ্যপ্রবাহের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের ভূমিকা অপরিসীম।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, মেরুকরণ এবং কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নিরাপত্তাহীনতায় দিশেহারা হয়ে পড়ছে সাংবাদিক পেশা।
বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দুর্নীতি ও ঘুষবিরোধী অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, মাদকবিরোধী সংবাদ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রকাশের কারণে অনেক সাংবাদিক হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার এমনকি হত্যার শিকার হচ্ছেন।
রাজনৈতিক সমাবেশ বা সংঘর্ষ কাভার করতে গিয়ে শারীরিক হামলার ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অপহরণ ও গুমের অভিযোগও উঠে এসেছে বিভিন্ন সময়ে।
একই সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার অপরাধ আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, যার মাধ্যমে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ও কারাবাস তাদের পেশাগত স্বাধীনতা ও কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সাংবাদিকরা নানা ধরনের হুমকি, ট্রোলিং ও নজরদারির শিকার হচ্ছেন, যা তাদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক হয়রানির বিষয়টি আরও প্রকট। প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেকেই সংবেদনশীল বিষয় এড়িয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছেন, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার জন্য বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যমতে, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকদের ওপর ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হামলার ঘটনা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি ভিন্নমত প্রকাশকারীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়।
সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলায় এক সাংবাদিককে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে মাদকবিরোধী সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি এই হামলার শিকার হন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় সাংবাদিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবাদিকদের ওপর এই ধরনের নির্যাতন কেবল একটি পেশার ওপর আঘাত নয়, বরং এটি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ওপর সরাসরি হুমকি। একটি স্বাধীন, নিরাপদ ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা না হলে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এসআর
মন্তব্য করুন: