আধুনিক নগরায়ন ও উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে চললেও পরিবেশ দূষণের দিক থেকে বাংলাদেশ, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, আজ এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি।
আন্তর্জাতিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় আবারও শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে ঢাকার বায়ুমান সূচক (একিউআই) রেকর্ড করা হয় ২৪১, যা “খুব অস্বাস্থ্যকর” পর্যায়ে পড়ে।
বায়ুমানের একিউআই স্কোর অনুযায়ী শূন্য থেকে ৫০ ভালো, ৫১ থেকে ১০০ মাঝারি, ১০১ থেকে ১৫০ সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর, ১৫১ থেকে ২০০ অস্বাস্থ্যকর, ২০১ থেকে ৩০০ খুব অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১ থেকে ৪০০ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। খুব অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় শিশু, প্রবীণ এবং শ্বাসকষ্ট বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। অন্যদেরও বাইরে কাজকর্ম সীমিত রাখতে বলা হয়। আর ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছালে তা নগরের সব বাসিন্দার জন্যই গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান কারণগুলো নতুন নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। দেশে বর্তমানে সাত হাজারেরও বেশি ইটভাটা চলছে, যার বড় অংশই পরিবেশগত মানদণ্ড মানছে না।
নির্মাণকাজের ধুলো, পুরোনো ও অযোগ্য যানবাহনের ধোঁয়া, উন্মুক্ত স্থানে কঠিন বর্জ্য পোড়ানো এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্গমন—সব মিলিয়ে ঢাকার বাতাস প্রতিনিয়ত আরও বিষাক্ত হয়ে উঠছে।
বায়ুদূষণের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাসের ফলে শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যান্সার এবং ডায়াবেটিসের মতো রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে বায়ুদূষণসহ চার ধরনের পরিবেশ দূষণের কারণে প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু ঘটেছে।
এর মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল বায়ুদূষণ।
শিশুদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতি আরও গভীর। দূষিত বাতাস তাদের ফুসফুসের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে এবং ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বায়ুদূষণ শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্যই হুমকি নয়, এটি দেশের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ক্ষতি করছে।
অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার ফলে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে। গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দূষণের কারণে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।
দূষণ কমাতে সরকার ইতোমধ্যে ২০২৪–২০৩০ সালের জন্য জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দেশে বর্তমানে ১৬টি কন্টিনিউয়াস এয়ার মনিটরিং স্টেশন রয়েছে এবং আরও ২৪টি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া অবৈধ ইটভাটা বন্ধে অভিযান, পুরোনো যানবাহন নিষিদ্ধের ঘোষণা এবং নির্মাণস্থলে ধুলো নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতার চিত্র ভিন্ন। এখনো অনেক অবৈধ ইটভাটা চালু রয়েছে, নির্মাণস্থলে ধুলো নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা নেই এবং পরিবেশ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও দুর্বলতা দেখা যায়। ফলে পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের অভাবে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হচ্ছে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দূষণ কমাতে সরকারকে আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, ইটভাটা ও নির্মাণখাতে পরিবেশবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে জরিমানা ও কারাদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে উন্নত ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি—যেমন সৌরশক্তি—ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব রান্নার প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
চতুর্থত, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত আঞ্চলিক উদ্যোগ গ্রহণ করে সীমান্তবর্তী বায়ুদূষণ কমানোর জন্য কার্যকর চুক্তি করতে হবে।
ঢাকা শহরের আকাশ প্রতিনিয়ত আরও বিষাক্ত হয়ে উঠছে। যদি এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে ঢাকার বাসিন্দাদের সামনে আরও বড় স্বাস্থ্য বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এখনই শক্ত হাতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা না হলে ঢাকা শুধু দূষিত শহরই নয়, ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য নগরীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
লেখক: শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক
ইমেইল: [email protected]
এসআর
মন্তব্য করুন: