বাংলাদেশের যুবসমাজ বর্তমানে এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি।
একদিকে বেকারত্ব, মানসিক চাপ ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে আধুনিক মোড়কে উপস্থাপিত নিকোটিনজাত পণ্যের সহজলভ্যতা। ই-সিগারেট, ভেপ ও হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টের মতো নতুন পণ্য তরুণদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে সরকারের সাম্প্রতিক সংশোধনী শুধু একটি আইনি পরিবর্তন নয়; বরং জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং বিশেষ করে যুবসমাজকে সুরক্ষিত রাখার একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তথাকথিত ‘কম ক্ষতিকর’ বা ‘স্টাইলিশ’ তকমা ব্যবহার করে ই-সিগারেট ও ভেপ তরুণদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলা হচ্ছে।
নানা ধরনের প্রচারণায় প্রলুব্ধ হয়ে অনেক কিশোর ও তরুণ নিকোটিন আসক্তির দিকে ঝুঁকছে। অথচ বাস্তবতা হলো, এসব পণ্য নিকোটিন নির্ভরতা তৈরি করে এবং একসময় প্রচলিত তামাক ব্যবহারের পথও প্রশস্ত করে।
নতুন সংশোধনীতে এই ধরনের পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ ও বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করায় তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কমবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—যুবসমাজকে কেন্দ্র করে নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় তামাক ও নিকোটিনজাত পণ্যের ওপর কড়াকড়ি আরোপের মাধ্যমে সরকার একটি শক্ত বার্তা দিয়েছে যে জনস্বাস্থ্য রক্ষা কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, এটি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ।
পাশাপাশি জরিমানা ও শাস্তির মাত্রা বাড়ানোয় আইন ভঙ্গের প্রবণতাও কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই যে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে, তা নয়। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কার্যকর বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকি ছাড়া ভালো আইনও অনেক সময় প্রত্যাশিত সুফল দিতে ব্যর্থ হয়।
বিশেষ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গোপন প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে তরুণদের আকৃষ্ট করার প্রবণতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত না হলে আইনটির পূর্ণ সফলতা অর্জন কঠিন হবে।
এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজের সম্মিলিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও যুব সংগঠনগুলোকে তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতিকর দিক নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তরুণদের শুধু নিষেধাজ্ঞার কথা না বলে, তথ্যভিত্তিক যুক্তি দিয়ে বোঝানো জরুরি যে সুস্থ জীবনই একটি নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি।
যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের এই সংশোধনী কার্যকর হলে তা শুধু ধূমপানের হার কমাতেই ভূমিকা রাখবে না, বরং একটি সচেতন, স্বাস্থ্যবান ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তুলতেও সহায়ক হবে।
যুবসমাজকে সুরক্ষা দেওয়া মানেই দেশের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা—এই উপলব্ধি থেকেই আইন প্রয়োগে সরকারকে আরও দৃঢ় ও ধারাবাহিক ভূমিকা রাখতে হবে।
এসআর
মন্তব্য করুন: