আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
এই নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোটার গোষ্ঠীগুলোর একটি হলো জেনজি প্রজন্ম। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় দেশের জেনজি তরুণরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে উঠেছে।
স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার শাসনামলে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্মকে নানাভাবে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হলেও, সেই সব প্রচেষ্টা ভেঙে দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সচেতনতা নিয়েই তারা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেয়।
সদ্য যৌবনে পা দেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া কিংবা সদ্য কর্মজীবনে প্রবেশ করা নাগরিকরাই আজকের জেনজি প্রজন্ম। এই প্রজন্মের হাত ধরেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল চাকরিতে কোটা সংস্কার ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার দাবি।
পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব, ভবিষ্যৎ চাকরির বাজারে বৈষম্যের আশঙ্কা এবং স্বৈরাচারের দমননীতিকে উপেক্ষা করেই তারা রাজপথে নেমেছিল। ফলে জাতীয় নির্বাচনে কর্মসংস্থান সৃষ্টি জেনজির কাছে অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠবে—এটাই স্বাভাবিক।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে প্রায় ২৭ লাখ বেকার থাকলেও বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি। উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেই প্রায় ২৭ শতাংশ বেকার।
পাশাপাশি বেসরকারি খাতে নির্দিষ্ট বেতন কাঠামোর অনুপস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে বেতনের বৈষম্য, চাকরির নিরাপত্তাহীনতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব—এসব প্রশ্নও জেনজির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ দুর্নীতি বন্ধের বিষয়টি তারা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে স্পষ্টভাবে জানতে চাইবে।
দেশের প্রায় ৭ কোটি ৩০ লাখ শ্রমশক্তির প্রায় ৯৫ শতাংশই বেসরকারি খাতনির্ভর। ২০২৫ সালের শুরুতে দেশে প্রায় ৮৬৪ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ এলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বছরের শেষ ছয় মাসে তা নেমে আসে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলারে।
টেকসই কর্মসংস্থান, কার্যকর বেতন কাঠামো এবং বেকারত্ব সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য বেসরকারি ও শিল্প খাতের বিকাশ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তাই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির প্রশ্নও জাতীয় নির্বাচনে জেনজির কাছে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশি তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৭০–৮০ শতাংশ স্টার্টআপের উদ্যোক্তার বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
২০২৩–২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে সরকারি সহযোগিতার অভাব, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ ও চাঁদাবাজির মতো সমস্যাগুলো স্টার্টআপ খাতের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে উদ্যোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জেনজির কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠবে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণেও জেনজির দৃষ্টি থাকবে। মধ্যস্বত্বভোগী, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এবং বড় আমদানিকারকদের কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কী ধরনের কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে চায়—তা জানতে আগ্রহী থাকবে তরুণ ভোটাররা।
সব মিলিয়ে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ—এই প্রশ্নগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের রূপরেখার দিকেই জেনজির নজর থাকবে।
বিশেষ করে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের নীতিগত অবস্থান এবং বাস্তব পরিকল্পনা তারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
নির্বাচনের আগে মুখস্থ প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবসম্মত রোডম্যাপই জেনজির কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে যারা গুলির মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেই জেনজি প্রজন্মই এবার নতুন বাংলাদেশের শাসক নির্ধারণে তাদের স্মার্ট ও কৌশলী ভূমিকা রাখবে—এমনটাই ধারণা করা যায়।
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
এসআর
মন্তব্য করুন: