ভালোবাসা কখনও ক্যালেন্ডারের তারিখে আবদ্ধ নয়।
সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসার প্রকাশ ও উদযাপনের ধরনও পাল্টেছে। যা একসময় ছিল লুকিয়ে রাখা আবেগ, তা আজ প্রকাশ্যে স্বীকৃত। ভালোবাসা দিবস তাই কেবল উৎসবের উপলক্ষ নয়, বরং সংযম, আন্তরিকতা ও সম্পর্কের প্রকৃত মূল্য অনুধাবনের দিন।
একসময় বাংলাদেশে প্রেম মানেই ছিল গোপনীয়তা। সত্তর ও আশির দশকে প্রেমিক-প্রেমিকারা চিঠির মাধ্যমে নিজেদের আবেগ প্রকাশ করতেন, রাতে ল্যান্ডফোনে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করতেন। নব্বইয়ের দশকে কিছুটা পরিবর্তন এলেও, ভালোবাসা দিবস উদযাপন ছিল প্রায় অকল্পনীয়।
২০০০ সালের পর মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সহজলভ্য হলে প্রেমের ধরনেও পরিবর্তন আসে। অপেক্ষার দিন শেষ হয়ে যায়, মুহূর্তেই ভালোবাসার মানুষকে জানানো সম্ভব হয় অনুভূতির কথা। এখন ডিজিটাল মাধ্যমের কল্যাণে ভালোবাসার প্রকাশ আরও উন্মুক্ত ও সহজতর হয়েছে।
ভালোবাসা দিবসের উৎপত্তি রোমান সাম্রাজ্যে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশে এর প্রচলন শুরু হয় নব্বইয়ের দশকের শুরুতে, তখনকার তরুণদের মধ্যে এটি সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে এর পরিসর বেড়েছে।
বর্তমানে শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই দিনটি উদযাপিত হয়। প্রেমিক-প্রেমিকারা ফুল, চকলেট, উপহার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের মাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশ করেন। ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট, পার্ক, শপিংমল—সবখানে বাড়ে তরুণ-তরুণীদের ভিড়।
এখন শুধু রোমান্টিক সম্পর্ক নয়, বন্ধু, পরিবার, এমনকি সহকর্মীদের প্রতিও ভালোবাসা প্রকাশের প্রবণতা বেড়েছে। বাবা-মা, ভাই-বোন কিংবা শিক্ষকের প্রতিও উপহার ও শুভেচ্ছা জানানোর চল গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে ভালোবাসা দিবস নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। কেউ একে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি বলে সমালোচনা করেন, কেউ বা তরুণদের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ মনে করেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের অনেক অংশই দিনটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। এখন শুধু তরুণরাই নয়, মধ্যবয়সী ও প্রবীণরাও ভালোবাসার বিভিন্ন রূপ উদযাপন করছেন।
ভালোবাসা শুধু একটি দিনের অনুভূতি নয়, বরং বছরের প্রতিটি মুহূর্তেই এর উপস্থিতি থাকা উচিত। এটি দায়িত্ব, যত্ন, সম্মান ও বোঝাপড়ার এক অনিঃশেষ ধারা।
বইমেলায় আসা এক শিক্ষার্থী মির্জা সানি বলেন, "ভালোলাগাই ভালোবাসা। কারও প্রতি ভালোলাগা না থাকলে তাকে ভালোবাসা যায় না।"
অন্য শিক্ষার্থী স্নিগ্ধা রায়ের মতে, "ভালোবাসা মানে তারুণ্য। প্রেম মানুষকে চিরতরুণ রাখে, বয়স যাই হোক না কেন।"
চাকরিজীবী নাঈম ইসলাম সোহাগ বলেন, "ভালোবাসাকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। তবে এটি যত্ন, দায়িত্ব ও অনুভূতির এক গভীর প্রবাহ, যা হৃদয়ে নীরবে প্রবাহিত হয়।"
মিতালী আক্তার মনে করেন, "ভালোবাসা মানে কেবল প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক নয়, বরং পরিবারের প্রতি স্নেহ, বন্ধুদের প্রতি নির্ভরতা, এমনকি সহকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা।"
সাদ্দাফ হাসান বলেন, "ভালোবাসতে আলাদা দিনের প্রয়োজন নেই ঠিকই, তবে বিশেষ দিন মানুষকে ভালোবাসা প্রকাশের সুযোগ দেয়। তাই ভালোবাসা দিবস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।"
প্রযুক্তির বিকাশ ভালোবাসার প্রকাশ সহজ করেছে, তবে অনুভূতির গভীরতা যেন হারিয়ে না যায়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সম্পর্ক কেবল উপহার, ছবি বা স্ট্যাটাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তরিকতা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে স্থায়ী করা প্রয়োজন।
ভালোবাসা দিবস কেবল উদযাপনের নয়, বরং সম্পর্কের প্রতি নতুন করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার দিন।
এসআর
মন্তব্য করুন: