ভারতভিত্তিক স্বাধীন সাংবাদিক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের ভিজিটিং ফেলো অর্ক দেব সম্প্রতি ঢাকায় এসে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।
এটি প্রকাশিত হয়েছে স্বাধীন অনলাইন গণমাধ্যম ইনস্ক্রিপ্ট ডট মি-তে।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙার প্রসঙ্গে
শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাড়ি ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ভাঙার বিষয়ে সরকার ব্যবস্থা নিতে পারলো না কেন—এ প্রশ্নে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘‘বিচার প্রক্রিয়া চলছে। এটি প্রমাণিত হলে আন্তর্জাতিকভাবে পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে। ভারত সরকার শেখ হাসিনা এবং কয়েকজন আওয়ামী নেতাকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে দেওয়া হবে না—সেটি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘৩২ নম্বরের ঘটনা বিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তবে আমরা এর পুনরাবৃত্তি চাই না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শক্তি প্রয়োগ করলে পরিস্থিতি আরও হঠকারী হয়ে উঠতে পারত। ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করা হয়েছে।’’
‘মব জাস্টিস’ ও আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গ
সরকার কি ‘মব জাস্টিস’ সমর্থন করছে—এ প্রশ্নে নাহিদ বলেন, ‘‘না, আমরা তা সমর্থন করছি না। অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা থাকে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণপিটুনির ঘটনায় আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।’’
পুলিশ প্রশাসনে আওয়ামী লীগের দলীয়করণের বিষয়ে নাহিদ উল্লেখ করেন, ‘‘হাসিনা শাসনকালে পুলিশ ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয় লোকজন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ঢাকার বাইরে বহু পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে, আবার অনভিজ্ঞ অনেককে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’’
জামায়াত প্রসঙ্গে অবস্থান
নাহিদ বলেন, ‘‘জামায়াতকে দীর্ঘদিন ইচ্ছাকৃতভাবে প্রাসঙ্গিক রাখা হয়েছে। তবে বর্তমানে তারা মুক্তিযুদ্ধের বিষয় মেনে বক্তব্য দিচ্ছে। তাদের একাত্তরের বিরোধিতার জন্য কাফফারা দিতে হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের এখনও কোনও অনুশোচনা নেই।’’
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ প্রসঙ্গ
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হবে কিনা—এ প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, ‘‘আমরা চাইলে আগেই ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করতে পারতাম। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করতে চেয়েছি। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট মতাদর্শকে বাংলাদেশ আর গ্রহণ করবে না বলে আমি মনে করি।’’
নির্বাচন ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
নাহিদ ইসলামের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন সম্ভব হতে পারে। তিনি বলেন, ‘‘জামায়াত কিংবা চরমোনাইয়ের মতো ইসলামপন্থী দলগুলো এবারে জনগণের সমর্থন পাবে না। তরুণদের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক ও সার্বজনীন চরিত্রের দলগুলোকেই মানুষ সমর্থন করবে।’’
শ্রমিক আন্দোলন ও সহিংসতা প্রসঙ্গ
তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিক বিক্ষোভ এবং পুলিশের গুলিতে শ্রমিক নিহতের ঘটনায় সরকার দুঃখ প্রকাশ করেছে। নাহিদ বলেন, ‘‘আমরা চেষ্টা করেছি ক্ষোভ প্রশমনের। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে। আমরা সেগুলো এড়ানোর চেষ্টা করেও সফল হইনি।’’
জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গে অবস্থান
শেখ হাসিনার ‘দেশ সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গেছে’ এমন দাবির প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগ জঙ্গিবাদ নিয়ে রাজনীতি করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ কখনো জঙ্গিবাদকে সমর্থন করেনি।’’
সাক্ষাৎকারের শেষ ভাগে নাহিদ ইসলাম উল্লেখ করেন, ‘‘বাংলাদেশ এখন নতুন পথের সন্ধানে রয়েছে। আমরা একাত্তর ও চব্বিশের চেতনাকে ধারণ করে নতুনভাবে দেশ গড়ে তুলতে চাই।’’
এসআর
মন্তব্য করুন: