[email protected] শনিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
১০ মাঘ ১৪৩২

রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় মিয়ানমারের অবস্থানে অসন্তোষ জানাল বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ৯:১৮ পিএম

সংগৃহীত ছবি

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) চলমান গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলায় মিয়ানমারের সাম্প্রতিক উপস্থাপনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার।

শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ আবারও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ও নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।

বাংলাদেশের মতে, এটি ২০১৬-১৭ সালে সংঘটিত নৃশংস ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’-এর দায় এড়ানোর একটি কৌশল।
বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরাকান অঞ্চলে বসবাসরত একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী। ‘রোহাং’ বা ‘রোশাং’ শব্দ থেকেই রোহিঙ্গা নামের উৎপত্তি, যা তাদের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতির দিক থেকে তারা রাখাইন অঞ্চলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিল এবং স্বাধীনতা-পূর্ব বার্মার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও তাদের উপস্থিতি স্পষ্ট।
বাংলাদেশ সরকার জানায়, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের মাধ্যমে মিয়ানমার রাষ্ট্রীয়ভাবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করে।

পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয় এবং ২০১৫ সালের নির্বাচনে তারা পুরোপুরি অংশগ্রহণের সুযোগ হারায়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬-১৭ সালে রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক উৎখাতের মাধ্যমে তাদের কার্যত রাষ্ট্রহীন করে ফেলা হয়।


বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, রোহিঙ্গা ভাষার সঙ্গে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার কিছু সাদৃশ্য থাকলেও এটি বাংলা ভাষা থেকে পৃথক। তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করা কেবল ইতিহাস বিকৃতি নয়, বরং একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা।


বাংলাদেশ স্মরণ করিয়ে দেয়, ১৯৭৮ সালের দ্বিপাক্ষিক প্রত্যাবাসন চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের ‘আইনসম্মত বাসিন্দা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল এবং সমাজে সমান অধিকারসহ পুনঃঅন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু গত আট বছরে মিয়ানমার সরকার রাখাইনে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

২০১৭-১৮ সালের চুক্তি সত্ত্বেও নানা অজুহাতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা হচ্ছে, যা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত দিতে পারে বলে মন্তব্য করা হয়।


বিবৃতিতে ২০২৩ সালের ৬ জুলাই মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এক কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে দেওয়া দাবিরও প্রতিবাদ জানানো হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় পাঁচ লাখ ‘বাঙালি’ রাখাইনে আশ্রয় নিয়েছিল। বাংলাদেশ জানায়, সে সময় রাখাইনের মোট জনসংখ্যাই ছিল ১৭ লাখের কম। এত বড় জনস্রোত হলে তা আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত হতো, কিন্তু পরবর্তী কোনো আদমশুমারি বা নির্ভরযোগ্য তথ্যে এমন দাবি প্রমাণিত হয়নি।


শেষে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানায়, রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করে তাদের স্বদেশে ফেরার বাস্তব পরিবেশ তৈরি করতে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত না করে টেকসই ও ন্যায্য সমাধানের পথে এগোনোর আহ্বান জানানো হয়।

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর