[email protected] শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
২৪ মাঘ ১৪৩২

ইপিএ চুক্তিতে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ

জাপানে বাংলাদেশের ৭,৩৭৯ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা, কর্মসংস্থানে বড় সুযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ৫:১৪ পিএম

বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক নতুন ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। আজ ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জাপানের রাজধানী টোকিওতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে দুই দেশের মধ্যে ‘অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি’ (Economic Partnership Agreement – EPA)।

এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো দেশের সঙ্গে সম্পাদিত প্রথম অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি, যা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন মাননীয় বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন, অপরদিকে জাপান সরকারের পক্ষে স্বাক্ষর করেন জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও। উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠানকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জাপানের বাজারে ৭,৩৭৯ পণ্যে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা বাংলাদেশ। এই চুক্তির আওতায় এখন থেকে তৈরি পোশাকসহ প্রায় ৭,৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য জাপানের বাজারে ১০০ শতাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য এই চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চুক্তিতে ‘সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় পোশাক রপ্তানিতে কাঁচামালের উৎস সংক্রান্ত জটিল নিয়ম শিথিল হয়েছে। ফলে তৃতীয় দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করেও বাংলাদেশি পোশাক জাপানে রপ্তানি করা যাবে, যা উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াবে।

জাপানে ১২০টি সেবা খাতে বাংলাদেশিদের কাজের সুযোগ। শুধু পণ্য রপ্তানিই নয়, এই ইপিএ চুক্তির মাধ্যমে আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং, শিক্ষা, কেয়ারগিভিং ও নার্সিংসহ মোট ১২০টি সেবা খাতে বাংলাদেশি দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য জাপানে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সুযোগ বাংলাদেশের জন্য রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশও জাপানের জন্য ৯৮টি উপ-খাত এবং ১,০৩৯টি পণ্যে শুল্কমুক্ত অথবা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা দিতে সম্মত হয়েছে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্য বজায় রেখে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাপানের সাথে বাংলাদেশের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নে সম্ভাবনা বাড়লো। অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির ফলে বাংলাদেশে জাপানি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং লজিস্টিকস খাতের মানোন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল, পরিবহন ব্যবস্থা ও স্মার্ট প্রযুক্তি খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ইপিএ চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্যিক সমঝোতা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশের জন্য এটি এলডিসি-উত্তর সময়ের প্রস্তুতিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। টোকিওতে বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে দুই দেশের প্রতিনিধিদল উপস্থিত থেকে উক্ত চুক্তি সম্পাদন করেন।

 

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর