ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের সময় তার ঘনিষ্ঠদের মাত্র ১৫ মিনিট সময় বেঁধে দিয়েছিল মার্কিন বাহিনী - এমন চাঞ্চল্যকর দাবি উঠে এসেছে একটি ফাঁস হওয়া ভিডিওতে। ভিডিওতে এই দাবি করেছেন দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ।
দুই ঘণ্টাব্যাপী ওই গোপন ভিডিওটি সাংবাদিক সংগঠন ‘লা হোরা দে ভেনেজুয়েলা’-এর হাতে আসে।
সেখানে দেখা যায়, মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার এক সপ্তাহ পর একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে রদ্রিগেজ নিজের অবস্থান ও সংকটকালীন অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছেন।
রদ্রিগেজের বক্তব্য অনুযায়ী, মাদুরোকে আটক করার পরপরই মার্কিন সেনারা আল্টিমেটাম দেয়—হয় তাদের শর্ত মানতে হবে, নতুবা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
তিনি দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট অপহরণের প্রথম মুহূর্ত থেকেই হুমকির মাত্রা চরমে পৌঁছে যায় এবং তাকে, তার ভাই হোর্হে রদ্রিগেজ ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেয়োকে সরাসরি হত্যার ভয় দেখানো হয়।
ভিডিওতে আরও বলা হয়, শুরুতে মার্কিন পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস জীবিত নেই এবং তাদের হত্যা করা হয়েছে। সে সময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, তারাও একই পরিণতির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন বলে দাবি করেন রদ্রিগেজ।
তবে মাদুরোর পতনের পর ভেনেজুয়েলার বর্তমান নেতৃত্ব প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করলেও বাস্তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধিকাংশ দাবিই মেনে চলতে হচ্ছে বলে ভিডিওতে ইঙ্গিত দেন তিনি। রদ্রিগেজের ভাষায়, এই সহযোগিতা ছিল কোনো পছন্দের বিষয় নয়, বরং স্থায়ী হুমকি ও চাপের মুখে নেওয়া এক ধরনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশকে সংঘাতমুক্ত রাখা, জিম্মি পরিস্থিতির অবসান ঘটানো এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা। ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করাকে তিনি ‘ব্ল্যাকমেইল থেকে বাঁচার উপায়’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেছেন, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হলে আমেরিকা আরও শক্তিশালী অর্থনীতির দিকে এগোবে।
তবে ট্রাম্প এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন—রদ্রিগেজ যদি তার প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হন, তাহলে তাকে মাদুরোর চেয়েও বড় মূল্য দিতে হতে পারে।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ভিন্নমত দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদ মার্গারিটা লোপেজ মায়া।
তার মতে, রদ্রিগেজ যে বয়ান তুলে ধরছেন, তা পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ শক্তিশালী কোনো গোষ্ঠীর সহযোগিতা ছাড়া শুধু মার্কিন বাহিনীর পক্ষে মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
মায়ার বিশ্লেষণে, রদ্রিগেজ বর্তমানে নিজেকে দায়মুক্ত ও দেশপ্রেমিক প্রমাণের জন্যই এই নাটকীয় তথ্য সামনে আনছেন। অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা, সমর্থকদের আশ্বস্ত করতে এবং রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করতেই এই ভিডিও প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ভিডিওতে রদ্রিগেজ স্বীকার করেন, এমন পরিস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তবুও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ধৈর্য ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থা কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে- এমন বাস্তবতা দেশটির সার্বভৌমত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। ট্রাম্পের প্রকাশ্য প্রশংসা আর রদ্রিগেজের হুমকির বর্ণনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তায়।
আন্তর্জাতিক পরিসরে অনেকেই এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রভাব বিস্তারের নজির হিসেবে দেখছেন।
এসআর
মন্তব্য করুন: