[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি ২০২৬
২৫ পৌষ ১৪৩২

জন্মের পরপরই শিশুর থাইরয়েড পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি

এমরানা আহমেদ

প্রকাশিত: ৬ জানুয়ারি ২০২৬ ৫:৪৯ পিএম

সংগৃহীত ছবি

মায়ের কোলে থাকা এক বছর বয়সী মৌমিতা শ্বাসকষ্টে ভুগছে, কান্না থামছে না।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বারডেম জেনারেল হাসপাতালের মা ও শিশু বিভাগে চিকিৎসকের অপেক্ষায় বসে থাকা শিশুটির মা সাবিনা জানান, জন্মগতভাবে থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত তার সন্তান।

এর ফলেই দীর্ঘদিন ধরে জন্ডিসসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছে মৌমিতা।

সরেজমিনে বারডেম হাসপাতালে দেখা যায়, সাবিনার মতো প্রতিদিন গড়ে আট থেকে দশজন থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত শিশু ও কিশোরের অভিভাবক চিকিৎসা নিতে আসছেন।

অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, থাইরয়েডজনিত সমস্যার কারণে অনেক শিশু শারীরিক ও মানসিক নানা জটিলতায় ভুগছে।


চিকিৎসকদের মতে, শিশুর জন্মের পর প্রথম তিন বছরেই মস্তিষ্কের বিকাশ সম্পন্ন হয়, যার বড় অংশ ঘটে প্রথম বছরেই। এ সময় শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশের জন্য থাইরয়েড হরমোন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই হরমোনের ঘাটতি হলে শিশুটি শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে উঠতে পারে, যাকে কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়।


সাধারণত থাইরয়েড গ্রন্থি সঠিকভাবে তৈরি না হওয়া বা হরমোন উৎপাদনে ত্রুটির কারণে এই সমস্যা দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস বিভাগের এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, থাইরয়েড কোনো সংক্রামক রোগ নয়, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি বংশগত।

গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি দুই হাজার ৩০০ শিশুর মধ্যে একজন জন্মগতভাবে থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত হয়। বাবা-মায়ের একজন আক্রান্ত হলে সন্তানের ঝুঁকি প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে একজন থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছেন। এর পেছনে আয়োডিনের ঘাটতি ও শারীরিক নানা দুর্বলতা বড় ভূমিকা রাখে। আয়োডিন থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আবার কোনো কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও থাইরয়েড হরমোনের নিঃসরণ কমে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, মাতৃগর্ভেই শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার জন্য থাইরয়েড হরমোন প্রয়োজন। তাই গর্ভবতী মায়েদের থাইরয়েড পরীক্ষা ও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতিতে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বুদ্ধির বিকাশ ও নিউরোলজিক্যাল উন্নয়ন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। জন্মের পর দীর্ঘস্থায়ী জন্ডিস, অতিরিক্ত ঘুম, খেতে অনীহা, ওজন বৃদ্ধি—এগুলো থাইরয়েড সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।

তিনি জানান, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ কোনো না কোনো থাইরয়েড সমস্যায় ভুগলেও আক্রান্তদের ৬০ শতাংশই চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন।

জীবনের চারটি ধাপে থাইরয়েড স্ক্রিনিং অত্যন্ত জরুরি—জন্মের পরপরই, বয়ঃসন্ধিকালে, গর্ভধারণের আগে এবং ৪০ বছর বয়সের পর।


ডা. শাহজাদা সেলিম আরও বলেন, থাইরয়েড সমস্যা মূলত দুই ধরনের—হাইপোথাইরয়েডিজম (হরমোন কম নিঃসরণ) ও হাইপারথাইরয়েডিজম (হরমোন বেশি নিঃসরণ)। শিশুদের মধ্যে হাইপোথাইরয়েডিজম বেশি দেখা যায়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে পরবর্তীতে শিশুকে আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো সম্ভব হয় না।


সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ডা. মো. মাজহারুল হক তানিম জানান, থাইরয়েড রোগীদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের ৯ জনই নারী। অনেকেই সাব-ক্লিনিক্যাল হাইপোথাইরয়েডিজমে ভুগছেন, কিন্তু বিষয়টি জানেন না।


বিশেষজ্ঞরা বলেন, উন্নত দেশে জন্মের পরপরই সব শিশুর থাইরয়েড পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। কারণ, লক্ষণ প্রকাশ পেতে সময় লাগে এবং তত দিনে শিশুর মেধা বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের দেশের বাস্তবতায় ঝুঁকিতে থাকা নবজাতকদের ক্ষেত্রে জন্মের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বা তিন-চার দিনের মধ্যে টিএসএইচ ও এফটি৪ পরীক্ষা করা জরুরি।


থাইরয়েড সমস্যা শনাক্ত হলে চিকিৎসায় সাধারণত লিভোথাইরক্সিন ব্যবহার করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বা আজীবন ওষুধ চালিয়ে যেতে হয়। সঠিক মাত্রা ও নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে আক্রান্ত শিশুরা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজন শুধু সচেতনতা ও সদিচ্ছা। জন্মের পরপরই থাইরয়েড পরীক্ষা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা থেকে রক্ষা করা সম্ভব। 

বাসস ইউনিসেফ ফিচার 

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর