[email protected] শুক্রবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫
২১ চৈত্র ১৪৩১

জাতিসংঘের প্রতিবেদন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ১৪০০ জনেরও বেশি মানুষ হত্যা

সাইদুর রহমান

প্রকাশিত: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ৩:২৪ পিএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থান

জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গত বছরের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ চলাকালীন বাংলাদেশে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, তৎকালীন সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক উপাদান এই দমন-পীড়নে জড়িত ছিল।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংস দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের শঙ্কা সৃষ্টি করছে এবং এর সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।

 

বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে যে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে ১,৪০০-রও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১২-১৩ শতাংশ শিশু বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে, বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে যে তাদের ৪৪ জন কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন।

 

বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের আদালতের রায়ের পর, তবে এটি সামগ্রিক প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তৎকালীন সরকার ধারাবাহিকভাবে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছিল।

 

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাই কমিশনার ভলকার তুর্ক বলেন, “এই সহিংস দমন-পীড়ন ছিল একটি পরিকল্পিত এবং সমন্বিত কৌশল, যা সরকারবিরোধী আন্দোলন মোকাবিলায় গৃহীত হয়েছিল।” তিনি আরও বলেন, “উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় ব্যাপক গ্রেফতার, নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।”

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের অনুরোধে জাতিসংঘের একটি বিশেষ দল বাংলাদেশে তদন্ত পরিচালনা করে। এতে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং অস্ত্র বিশ্লেষকরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার তদন্ত কাজে সহযোগিতা করেছে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহ করেছে।

 

প্রতিবেদনে আবু সাঈদ নামে এক বিক্ষোভকারীর ঘটনাও বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের সামনে দু’হাত ছড়িয়ে নিজেকে গুলি করার আহ্বান জানান এবং পরবর্তীতে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে জানা যায়। ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছিল।

 

নারী বিক্ষোভকারীরা নির্বিচারে গ্রেফতার, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার ঘটনাগুলোও নথিভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে শারীরিক আক্রমণ এবং হুমকির বিষয় অন্তর্ভুক্ত।

 

এছাড়া, নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক শিশুদের ওপর সহিংসতা চালানোর তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিভিন্ন ঘটনায় শিশুদের গুলিবিদ্ধ করা হয়েছে, গ্রেফতার করা হয়েছে এবং নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী আহতদের চিকিৎসা প্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করেছে এবং হাসপাতাল থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেছে, যা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন।

 

প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং প্রতিশোধমূলক আক্রমণের ঘটনাগুলোকেও নথিভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য বিচার ও জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাই কমিশনার বলেন, “একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় নিরূপণ ও পুনরাবৃত্তি রোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর