[email protected] মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬
২২ বৈশাখ ১৪৩৩

নিয়মের বালাই নেই মতিঝিল আইডিয়ালে

সাইদুর রহমান

প্রকাশিত: ৫ মে ২০২৬ ১২:৪০ পিএম

সংগৃহীত ছবি

• দায়িত্বে না থেকেও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বানান সভাপতি

রাজধানীর শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে এরআগে মেয়াদত্তীর্ণ অবস্থায় দায়িত্ব পালন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নিয়ম বহির্ভূতভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ একাধিক শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষকদের বরখাস্ত করার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

৩৬  হাজার শিক্ষার্থীর এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাণিজ্যসহ নানাখাতে কয়েক কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও জমা পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে সহসাই মন্ত্রণালয় ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে আলাদা তদন্ত শুরু হবে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির এডহক কমিটির বর্তমান সভাপতি এস, এম জহরুল ইসলাম জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে ঢোকেন।

ছয়মাসের জন্য এডহক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পান ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি।

সে হিসেবে তার মেয়াদ ছিল ওই বছরের ২৯ জুলাই পর্যন্ত। 


অনুসন্ধানে জানা গেছে, সভাপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জহরুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানটিতে ওই বছরের ০৩ আগস্ট রেজুলেশন করে লায়লা আক্তারকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেয়া হয়।


তবে নিয়ম অনুযায়ী এডহক কমিটি এমন নিয়োগ দিতে পারেন না বলে জানিয়েছেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এহসানুল কবির ।শুধু তাই নয়, কাউকে দায়িত্ব দিতে হলেও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে অবহিত করতে হয়। কিন্তু লায়লা আক্তারের এর বেলায় কিছুই করা হয়নি।

যদিও এডহক কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকা এস.এম জহরুল ইসলামের দাবি, যেসব অভিযোগের কথা বলা হয়েছে তা ফলস (মিথ্যা)।

এদিকে ৩ আগস্ট নিয়োগ পেয়ে চলতি বছরের ৯ মার্চ পর্যন্ত  অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে চলে গেছেন লায়লা আক্তার। যদিও তার দাবি, তাকে নিয়োগ নয়, দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।


অভিযোগ আছে, লায়লা আক্তারকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেয়ার পর ভর্তি বাণিজ্য, শিক্ষক নিয়োগ, স্কুলের বিভিন্ন খাত থেকে আদায় হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ নয়ছয়ের ঘটনা ঘটে।

যে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা।যা আমলে নিয়ে তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়।


অন্যদিকে নিজের মেয়াদ শেষ হলেও ওই বছরের ৩০ জুলাই থেকে ২৯ নভেম্বর পর্য ন্ত সভাপতির কাজ চালিয়ে যান জহরুল ইসলাম। নিয়ম অনুযায়ী, এভাবে দায়িত্ব পালন করার কোনো সুযোগ নেই। শুধু তাই নয়, জহরুল ইসলাম নিজের মালিকানাধীন ঢাকার বাইরে অবস্থিত আবাসন প্রকল্পে আইডিয়ালের শাখা খোলারও চেষ্টা করেন বলে জানা গেছে।


অভিযোগ আছে, সরকারের সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তা আবারও আইডিয়ালের সভাপতি হওয়ার জন্য চেষ্টা চালান। তাতে তিনি সফলও হন। সবশেষ চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি আবার এডহক কমিটির সভাপতি হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন এস, এম জহরুল ইসলাম।


অবশ্য মাঝে অল্প কিছুদিনের জন্য ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) আজমল হোসেনকে আইডিয়ালের অন্তবর্তীকালীন সভাপতি দায়িত্ব দেয়া হয়।

তিনি ২০২৫ সালের ০১ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পর্য ন্ত দায়িত্ব পালন করেন।


মেয়াদ শেষে দায়িত্ব পালন, শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার সুযোগ আছে কিনা এমন জানতে চাওয়া হলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এহসানুল কবির বলেন, ‘কোনো এডহক কমিটি কাউকে নিয়োগ দিতে পারেন না।

কাউকে দায়িত্ব দিতে হলেও মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক অধিদপ্তরকে অবহিত করতে হবে। কিন্তু মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের যে অভিযোগ উঠেছে এটা সত্য হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। এডহক কমিটি নিয়োগ দিলে তা বৈধ হবে না।


প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কোনো ধরণের অনিয়ম হলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান বোর্ডের চেয়ারম্যান।


আর্থিক অনিয়ম ও ভর্তি বাণিজ্য- 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কয়েক কোটি টাকার আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

এ সংক্রান্ত লিখিত অভিযোগ আমলে নিয়ে গত ১৫ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব শিরিন আক্তার স্বাক্ষরিত চিঠিতে তদন্ত কমিটি করার কথা জানানো হয়।


এতে অভিভাবকদের পক্ষ থেকে করা অনিয়মের অভিযোগের বিষয় উল্লেখ করে তদন্ত করার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।


অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, স্কুল কর্তৃপক্ষের সেশন ফি আদায়, যেসব খাতে বেতন নেয়ার কথা বলা হয় তাতে খরচ কম হলেও বেশি টাকা নেয়া হয়।

ব্যয়ের কোনো খাত নেই এমন খাতেও টাকা নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।


এছাড়া সভাপতির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব যানবাহন (ঢাকা মেট্রো চ- ৫৩-৫৪৪২) ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি সাধনের অভিযোগও আছে।


জমি ক্রয় ও শিক্ষকদের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ-

অভিযোগ রয়েছে, দোহারে একটি আবাসন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেখানে আইডিয়াল স্কুলের শাখা খোলার নাম করে শিক্ষকদের কাছ থেকে বড় অংকের অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেন সভাপতি। গ্লোরিয়াস প্রপার্টিজ নামের এই আবাসন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জহরুল ইসলাম নিজে।


জমি কেনার প্রস্তাবে যারা অনাগ্রহ দেখাচ্ছে তাদের বিভিন্নভাবে পেশাগত চাপে রাখা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী শিক্ষকরা দাবি করেছেন।


এ বিষয়ে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রওশন জাহান বলেন, সভাপতি স্যার দোহারে একটি শাখা খোলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমরা এটা দেখতেও গেছিলাম।

কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।


এছাড়া শরীর চর্চা শিক্ষক তামান্না জাহান, প্রভাতী শাখার সহকারী প্রধান শিক্ষক মনিরুল হাসান, ইংরেজী ভার্সনের সহকারী প্রধান শিক্ষক রোকনুজ্জামান শেখকে যৌক্তিক কোনো কারণ ছাড়াই বরখাস্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক বলেন, কেরাণীগঞ্জে একটি আবাসন প্রকল্পে শাখা খুলে সেখানে নেয়ার জন্য চাপ প্রয়োহগখোলার নামে আমাদের থেকে অর্থ আদায় করার চেষ্টা করা হয়। যারা রাজি হননি তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করারও অভিযোগ উঠেছে। 
যা বললেন সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ- 
অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিয়ম লঙ্ঘন করে অধ্যক্ষসহ অন্যান্য শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে তা অস্বীকার করেন এডহক কমিটির সভাপতি এস এম জহরুল ইসলাম।তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ টোটাললি ফলস। আমি নিয়মের ব্যত্যয় করে কোনো কিছু করিনি। আপনি কাগজপত্র দেখেন (এরপরই ফোন কেটে দেন তিনি)।


আর নিয়ম লঙ্ঘন করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া লায়লা আক্তার দুর্নীতি, অনিয়মের বিষয় নিয়ে বলেন, আমি জানতাম না আমাকে অধ্যক্ষ করা হবে।

আগের অধ্যক্ষ ফেরদৌস স্যার পদত্যাগ করায় আমাকে ডেকে নিয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়। এটা নিয়োগ না। আর দায়িত্ব দিলে বোর্ড বা কারও অনুমতি নিতে হয় না।


অধ্যক্ষের চেয়ারে বসার পর সভাপতির সঙ্গে মিলে নিয়ম না মেনে একাধিক শিক্ষক নিয়োগ, আর্থিক অনিয়ম করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘সভাপতি স্যার (জহরুল ইসলাম) সৎ মানুষ। আমিও অনিয়মে জড়িত না। আর্থিক অনিয়ম হলে সেখানে আমিও যেতাম না।’

 

এসআর

সম্পর্কিত খবর