[email protected] শনিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
১৮ মাঘ ১৪৩২

যাত্রাবাড়ী-ডেমরা-কদমতলী(আংশিক)

ঢাকা-৫ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস

সাইদুর রহমান

প্রকাশিত: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ২:২৩ পিএম

তিন প্রতীকের প্রার্থী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু হতেই রাজধানীর রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনী আমেজ। সারাদেশের মতো যাত্রাবাড়ী, ডেমরা ও কদমতলীর (আংশিক) একাংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-৫ সংসদীয় আসনেও বইছে ভোটের হাওয়া।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  দুর্বার এই আসনের প্রার্থীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগে; ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে চাইছেন সমর্থন ও ভোট।

নির্বাচনী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এ আসনে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটের মূল লড়াইটি হবে মূলত বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের মধ্যে।

ভোটারদের মতে, মাঠের রাজনীতিতে এই তিন দলের প্রার্থীই তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। বড় দলগুলোর প্রার্থী বাছাইয়ের সমীকরণ ও আঞ্চলিক জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে ঢাকা-৫ আসনে এবার ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস মিলছে।

 

ঢাকা-৫ আসনে প্রায় পাঁচ লাখ ভোটার রয়েছেন। যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, ধলপুর, গোলাপবাগ, নুরপুর, পাটেরবাগ, ইসলামবাগ, জনতাবাগ, স্মৃতিধারা, রায়েরবাগ, দনিয়া, সরাই, রসুলপুর, কুতুবখালী, ছনটেক, শেখদী, গোবিন্দপুর, কাজলার পাড়, মাতুয়াইল, কোনাপাড়া, ডগাইর, মোমেনবাগ, রহমতপুর, মুসলিমনগর, মধুবাগ, খানবাড়ী, আদর্শবাগ, বামৈল ও সারুলিয়াসহ বিস্তৃত এলাকা নিয়ে এই আসনটি গঠিত।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এসব এলাকায় নানাভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। পুরো এলাকাজুড়েই এখন নির্বাচনী আমেজ বিরাজ করছে।

 

আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-৫ আসনে মোট ১১ জন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন।

তারা হলেন— বিএনপির মো. নবী উল্লা, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ কামাল হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাজী মো. ইবরাহীম, গণঅধিকার পরিষদের সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহিম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির তোফাজ্জল হোসেন মোস্তফা, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের মো. তাইফুর রহমান রাহী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) শাহিনুর আক্তার সুমি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির মো. হুমায়ূন কবির, জাতীয় পার্টি-জেপির মীর আব্দুস সবুর, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মো. গোলাম আযম এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. সাইফুল আলম।

 

যাত্রাবাড়ী থানার অন্তর্ভুক্ত শেখদী এলাকার বাসিন্দা ফজলুর রহমান বলেন, “এই আসনে ধানেরশীষ ও হাতপাখা মনোনীত প্রার্থীর প্রচারণা ও গণসংযোগ সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে। তাই মনে হচ্ছে, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই দুই প্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে জামায়াত ইসলামীর প্রার্থীরও ভোট ব্যাংক রয়েছে।”

 

অন্যদিকে মাতুয়াইলের বাসিন্দা বাদশা মিয়া এলাকার দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে বলেন, “আমাদের এলাকায় সমস্যার শেষ নেই। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, নিচু এলাকা হওয়ায় জলাবদ্ধতার কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।” গ্যাস সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এবার কোনো প্রতীক দেখে নয়, বরং যিনি এই সমস্যাগুলো সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করবেন, তাকেই আমরা ভোট দেব।”

তিনি আরও বলেন, “প্রার্থীরা নির্বাচনের আগে অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ভোটের পর সেগুলো কতটুকু বাস্তবায়ন হয়, সেটিই দেখার বিষয়। আমরা এবার প্রতিশ্রুতির চেয়ে কাজের প্রতিফলন বেশি দেখতে চাই।”

স্বাধীনতার পর থেকে এই আসনে ঘুরেফিরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। সর্বশেষ ২০০১ সালে ঢাকা-৫ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে জয় পেয়েছিলেন বিএনপি নেতা কামরুল ইসলাম। এরপর দীর্ঘ দুই দশক ধরে এই আসনে আর জয়ের মুখ দেখেনি দলটি। দীর্ঘ ২০ বছর পর নিজেদের এই আসন পুনরুদ্ধারে এবার মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে বিএনপি।

ঢাকা-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক নবী উল্লাহ নবী প্রতিদিনের বাংলাকে বলেন, “আমি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে স্থানীয় রাজনীতি করে আসছি। এই এলাকার সন্তান হিসাবে দীর্ঘ পথচলায় আমি সব সময়ই মানুষের পাশে ছিলাম। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আমার এলাকাতেই সর্বপ্রথম দুর্বার আন্দোলন শুরু হয়, যাতে আমার কর্মী সমর্থকরা স্বকীয় ছিলো। বর্তমানে আমি ঘরে ঘরে গিয়ে গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছি এবং সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।


নবী উল্লাহ নবী আরও বলেন, “নির্বাচিত হলে আমাকে অতীতের ন্যায় ভবিষ্যতেও বৃহৎ পরিসরে কাজ করবো ইনশাআল্লাহ। নির্বাচিত হলে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, খেলার মাঠ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি গ্যাস সংকট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করব ইনশাআল্লাহ।”

জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “২০১৮ সালের নির্বাচনে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে আমি ৭০ হাজার ভোট পেয়েছিলাম, যা সেই সময়ের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সারাদেশের বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। এবার যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তবে সর্বোচ্চ ভোট পাব বলে বিশ্বাস করি। ইনশাআল্লাহ, আমিই জয়যুক্ত হব।”

 

অন্যদিকে ঢাকা-৫ আসনে বড় চমক দেখাতে চায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হাজী মো. ইব্রাহীম। তিনি ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডের দুইবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে বলে জানা যায়।

১১ দলীয় নির্বাচনী সমঝোতা থেকে বেরিয়ে ইসলামী আন্দোলন সারাদেশে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিতে মাঠে নেমেছে।

একাধিক সূত্রের দাবি, ঢাকা-৫ আসনে দলটি বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

এ বিষয়ে ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আব্দুর রহমান ভুঁইয়া প্রতিদিনের বাংলাকে বলেন, “ইব্রাহীম কমিশনার অত্যন্ত ভালো মানুষ। তিনি নির্বাচিত হলে এলাকায় উন্নয়ন হবে। বিগত দিনে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাই আমরা হাতপাখায় ভোট দেব।”

এই আসনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইসলামি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকায় ইসলামপন্থী প্রার্থী হিসেবে হাজী মো. ইব্রাহীম বাড়তি সুবিধা পাবেন বলেও মনে করছেন অনেকে।

হাজী মো. ইব্রাহীম প্রতিদিনের বাংলাকে বলেন, “আমি ঢাকা-০৫ আসনে প্রার্থীতা ঘোষণা করার পর থেকে এলাকার গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে জনগণ আমাকে দুইবার কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত করেছে। আমি সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছি কিনা জরিপ করে দেখুন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হলেও দল-মত নির্বিশেষে সকল মানুষ আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। তাই আগামী নির্বাচনে আমি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।”

 

অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, “আমি প্রার্থী হওয়ার আগেই জনস্বার্থ রক্ষায় কাজ করে আসছি। জুলাই বিপ্লবের সময় আমাদের এই এলাকার মানুষের পাশে ছিলাম।” তিনি আরও বলেন, “জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা এবং নতুন বাংলাদেশ গড়তে জনগণ এবার সৎ, যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব বেছে নেবে বলে আমার বিশ্বাস।

পর্যাপ্ত সরকারি হাসপাতাল, কলেজ ও খেলার মাঠ নেই। নির্বাচিত হলে এসব সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি এলাকাকে চাঁদাবাজিমুক্ত করতে কঠোর ভূমিকা রাখব।”

 

বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের পাশাপাশি অন্যান্য দলের প্রার্থীরাও ঢাকা-৫ আসনে প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে এই আসনে এবারের নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের আগ্রহ বাড়ছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি লড়াইয়ের ইঙ্গিত মিলছে।

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর