[email protected] সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬
২৯ পৌষ ১৪৩২

সরকারী আদেশের পরেও অধ্যক্ষ নিজ কার্যালয়ে বসতে পারছেন না

বর্ণমালায় মব সৃষ্টি করে অধ্যক্ষ অপসারণ, প্রভাষকের চেয়ার দখল

আশরাফুল আলম

প্রকাশিত: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ ২:৪৩ এএম

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ওয়াহিদুজ্জামান সিজু ও প্রতিষ্ঠানের লোগো

সরকারি নীতিমালা, শিক্ষা প্রশাসনের নির্দেশনা প্রকাশ্যে উপেক্ষা করে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার বর্ণমালা স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভয়াবহ ‘মবতন্ত্র’ কায়েমের অভিযোগ উঠেছে।

সংঘবদ্ধভাবে ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ভূইয়া আবদুর রহমানকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার পর প্রভাষক ওয়াহিদুজ্জামান সিজু নিজেকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ঘোষণা দিয়ে কলেজের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দখল করেন এমন গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।

ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ১৩ আগস্ট। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ওইদিন বিকেলে কলেজের অধ্যক্ষ ভূঁইয়া আবদুর রহমানকে একটি সংঘবদ্ধ মবের মাধ্যমে ভয় দেখানো ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়।

কলেজ প্রাঙ্গণে হঠাৎ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে নিরাপত্তাহীনতার মুখে তিনি দায়িত্ব পালন অসম্ভব মনে করে পদত্যাগে বাধ্য হন। আর উক্ত মবটি স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং দনিয়া কলেজের সামনে প্রতিবন্ধী চা বিক্রেতা আবুল এর ছেলে ইয়াছিন এর নেতৃত্বে সংঘটিত হয়। 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে অধ্যক্ষ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। ঘটনার পরপরই ওয়াহিদুজ্জামান সিজু নিজেকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ঘোষণা করে কলেজের প্রশাসনিক কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন।

নীতিমালার প্রকাশ্য লঙ্ঘন-মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আওতাধীন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো অধ্যক্ষের পদ শূন্য হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষা কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ বা যোগদান সম্পূর্ণভাবে অবৈধ।

একই সঙ্গে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে যোগ্য শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, বর্ণমালা স্কুল অ্যান্ড কলেজে এসব আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কোনোটিই অনুসরণ করা হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষক জানান, কলেজে অন্তত ৬–৭ জন জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও তাঁদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষকদের জিম্মি করে মব সৃষ্টি করা হয় এবং জোরপূর্বক স্বাক্ষর আদায়ের মাধ্যমে ওয়াহিদুজ্জামান সিজু ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের চেয়ার দখল করেন।

রাজনৈতিক প্রভাব ও অবৈধ নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। একজন শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, ক্যাম্পাসে সবাই ওয়াহিদুজ্জামান সিজুকে আওয়ামী লীগপন্থী সুবিধাভোগী হিসেবেই চেনে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি শিক্ষা নীতিমালা উপেক্ষা করে দায়িত্ব দখল করেছেন।

তিনি আরও জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর শাহাদাত হোসেন নামে এক শিক্ষককে অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, শাহাদাত হোসেন আব্দুল বারীর আত্মীয়।

এ ছাড়া মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আব্দুল বারীকে ‘সহকারী অধ্যক্ষ’ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে ওয়াহিদুজ্জামান সিজুর বিরুদ্ধে। যদিও ইন্টারমিডিয়েট কলেজে এ ধরনের কোনো পদের আইনগত অস্তিত্ব নেই।

একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, গত ১৭ মাসে ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান উদ্বেগজনকভাবে অবনতি হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশও উপেক্ষিত-জোরপূর্বক পদত্যাগের ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ একাধিকবার কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। সর্বশেষ স্মারক নং ৩৭,০০,০০০০,০৭২,৪৪,০০০২,২৫-০২ (তারিখ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬) অনুযায়ী, জোরপূর্বক পদত্যাগ, হেনস্তা ও চাপ প্রয়োগের ঘটনায় তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন-ভাতা চালু রাখা এবং তাঁদের নাম ইএফটি তালিকায় বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক প্রফেসর বি. এম. আব্দুল হান্নান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, অধ্যক্ষ ভূঁইয়া আবদুর রহমান এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক খান নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি এবং তাঁদের স্বপদে বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই নির্দেশনা অনুযায়ী অধ্যক্ষ ভূঁইয়া আবদুর রহমান কলেজে যোগদান করতে গেলে তাঁকে বাধা দেওয়া হয়। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কলেজের অধ্যক্ষের কক্ষটি তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।

আতঙ্ক ও ক্ষোভে শিক্ষক–শিক্ষার্থীরা- ঘটনার পর থেকে বর্ণমালা স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ, ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। অনেকেই এ ঘটনাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘মবতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, শিক্ষক মর্যাদা এবং আইনের শাসন প্রকাশ্যে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে।

তাঁরা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত, অবৈধভাবে দায়িত্ব দখলকারীদের অপসারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

এ প্রসঙ্গে বক্তব্য নেওয়ার জন্য প্রভাষক ওয়াহিদুজ্জামান সিজুর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। 

 

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর