নতুন বছরের প্রথম দিন।
ঘন কুয়াশা আর কনকনে শীতের ভেতর উদীয়মান সূর্য যেন নতুন শুরুর বার্তা নিয়ে এসেছে।
বছরের এই সময়টাতে মানুষ যেমন ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আঁকে, তেমনি ফিরে তাকায় পেছনের দিনগুলোর প্রাপ্তি ও অপূর্ণতার দিকে।
সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা—এই বাস্তবতাই প্রতিফলিত হয় মানুষের ভাবনায়।
এই বাস্তবতার মধ্যেই প্রতি বছর কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় হাজারো শিক্ষার্থী, যাদের চোখে থাকে স্বপ্ন আর মনে থাকে প্রত্যাশা। কারও কাছে এই ক্যাম্পাস সাফল্যের সিঁড়ি, আবার কারও কাছে হতাশার নাম।
স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিছুটা হলেও আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক মানে উত্তরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনায় এখনও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত শিক্ষক ও ক্লাসরুমের সংকট, সেশনজট - এসব সমস্যা দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কারণ।
নতুন বছরে এসব সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশা জানিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা তাদের ভাবনা তুলে ধরেছেন।
আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ক্যাম্পাসের প্রত্যাশা- নতুন বছরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও আধুনিক ক্যাম্পাস হিসেবে দেখতে চান আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী রেজাউল ইসলাম রাকিব।
তাঁর মতে, ডিজিটাল ক্লাসরুম, স্মার্ট লার্নিং সিস্টেম ও প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষার মান আরও যুগোপযোগী হবে। তিনি বলেন, একটি সমন্বিত স্টুডেন্ট পোর্টাল চালু হলে ভর্তি কার্যক্রম, ফি পরিশোধ, ফলাফল, নোটিশ ও অন্যান্য একাডেমিক সেবা আরও সহজ ও স্বচ্ছ হবে।
পাশাপাশি আধুনিক ই-লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অনলাইন জার্নাল, ই-বুক ও গবেষণাভিত্তিক ডেটাবেজ ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে, যা শিক্ষার্থীদের গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
শিক্ষার্থীবান্ধব ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার পরিবেশ- বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোজাহিদ হোসেন মনে করেন, ৪৬ বছরের পথচলায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় অনেক দূর এগোলেও এখনও প্রশাসনিক ও কাঠামোগত কিছু জটিলতা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সমস্যায় ফেলছে।
তার মতে, সেশনজট নিরসন, পর্যাপ্ত আবাসন নিশ্চিতকরণ, ক্যাম্পাসে আলোকসজ্জা বৃদ্ধি, সার্টিফিকেট উত্তোলন প্রক্রিয়া সহজ করা, লাইব্রেরি ও মেডিকেল সেবার আধুনিকায়ন এবং সকল একাডেমিক সেবা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর করা এখন সময়ের দাবি। তিনি প্রত্যাশা করেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় হবে একটি শিক্ষার্থীবান্ধব, সহনশীল ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র—যেখানে সহিংসতা ও অপ্রয়োজনীয় রাজনীতির স্থান থাকবে না।
উন্নত শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে ইবির স্বপ্ন
কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষার্থী উম্মে মাহিমা হিমা বলেন, বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীরা হিসাব করে দেখে কী পেল, আর কী পেল না। তাঁর মতে, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার অভাব এখন শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় ভোগান্তির কারণ।
ভর্তি ও সেমিস্টার ফর্ম পূরণে এখনও অ্যানালগ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা সময় ও শ্রম দুটোই নষ্ট করছে। পাশাপাশি অনেক বিভাগে ল্যাব, ক্লাসরুম ও শিক্ষক সংকট প্রকট। এসব সমস্যার দ্রুত সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করেন তিনি।
মুক্তচিন্তা ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষার প্রত্যাশা
ল’ অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী খোকন বর্মন বলেন, বিস্তীর্ণ এই ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে আছে হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। তাঁর কাছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি আবেগ, সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ গড়ার প্রেরণার নাম।
তিনি বলেন, নানা জাতি ও ধর্মের শিক্ষার্থীদের মিলনস্থল এই ক্যাম্পাস সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ শেখায়। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে শিক্ষার্থীরা মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারে, গবেষণায় আগ্রহী হয় এবং নিজেদের মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটাতে পারে।
নতুন বছরে তাঁর প্রত্যাশা—ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আরও আধুনিক, গবেষণাভিত্তিক ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করবে।
এসআর
মন্তব্য করুন: