[email protected] শুক্রবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫
২১ চৈত্র ১৪৩১

নানামুখী চাপে দেশের অর্থনীতি

সাইদুর রহমান

প্রকাশিত: ১৫ মার্চ ২০২৫ ৩:৩৫ এএম
আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৫ ৩:৪০ এএম

ফাইল ছবি

রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, আমদানিতে উচ্চ শুল্ক এবং ঋণের উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন কারণে দেশের অর্থনীতি চাপে রয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রাজস্ব আদায়ের বৃদ্ধি আশানুরূপ না হওয়ায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

এই অবস্থায় ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর নির্ধারিত স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্যবসায়ীরা ও অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় এলডিসি উত্তরণের জন্য আরও দুই থেকে তিন বছর সময় প্রয়োজন।

যদিও অন্তর্বর্তী সরকার নির্ধারিত সময়েই উত্তরণের ঘোষণা দিয়েছে, তবে এ বিষয়ে পর্যালোচনা করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, জাতিসংঘে উপস্থাপিত পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক সূচকগুলো ভুল ছিল, যা এখন সংশোধন করে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশ বেশকিছু বিশেষ সুবিধা হারাবে। বিশেষ করে রপ্তানি বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার হারানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

পরিকল্পনা বিভাগের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, এলডিসি সুবিধা হারানোর কারণে বছরে আনুমানিক সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৭৩ শতাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় রয়েছে, যা উত্তরণের পর আর থাকবে না।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১.৮ শতাংশ, যেখানে উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ১.৪৩ শতাংশ।

তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিকল্পনাহীনভাবে এলডিসি উত্তরণ হলে তা অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।’

বাংলাদেশ রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, ‘বর্তমান বাস্তবতায় এলডিসি উত্তরণ এখনই সম্ভব নয়।

বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, ভুল পরিকল্পনার কারণে অনেকে এলডিসি থেকে বের হয়ে আবার ফেরত যেতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশকেও ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত সংশোধন করে নতুন রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।’

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এলডিসি উত্তরণের পর নগদ সহায়তার বিকল্প কী হবে, তা নিয়ে সরকার এখনও পরিষ্কার কোনো পরিকল্পনা উপস্থাপন করেনি। রপ্তানি শিল্পে বিদ্যমান প্রণোদনা এবং কর সুবিধার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

অন্যদিকে, তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে বিকল্প খাতগুলো যেমন ওষুধ, চামড়া, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, সেমিকন্ডাক্টর এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানি বাড়াতে কার্যকর নীতিমালা এখনও প্রণয়ন হয়নি।

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‍্যাপিড)-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে ভিয়েতনামের মুক্তবাণিজ্য চুক্তির কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি ২১.২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

একইসঙ্গে এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী সময়ে ইইউ বাজারে শুল্ক সুবিধা হারানোর ফলে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ হ্রাসের ঝুঁকিতে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলডিসি উত্তরণের জন্য পরিকল্পনার অভাব এবং নীতির দুর্বলতা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই অর্থনীতি ও রপ্তানি খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নতুন ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা গ্রহণের ওপর জোর দিতে হবে।

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর