[email protected] সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
১০ ফাল্গুন ১৪৩২

এনআরবিসি ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা সংকট, আস্থাহীনতায় বাড়ছে উদ্বেগ

সাইদুর রহমান

প্রকাশিত: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ৯:১০ পিএম

ছবিঃ ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান ও এম ডি

সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি এখন চরম অব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্তে অস্বচ্ছতা ও কর্মী হয়রানির অভিযোগে গভীর সংকটে পড়েছে।

ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদুল আলম খানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ-বদলিতে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা ও একাংশ শেয়ারহোল্ডার।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি; ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা ও বার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি, তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে সংযুক্ত করা হবে।

 

গত ১২ মার্চ ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংক–এর হস্তক্ষেপে আগের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করা হয়, কিন্তু পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত একটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে বোর্ডে নির্দিষ্ট অনুপাতে শেয়ারধারী পরিচালক থাকার বাধ্যবাধকতা মানা হয়েছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কারণ বর্তমান বোর্ডের সাতজন পরিচালকের কেউই শেয়ারহোল্ডার নন বলে অভিযোগ রয়েছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাভাবিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলেও দাবি করা হচ্ছে।

প্রধান কার্যালয় থেকে শাখা পর্যায় পর্যন্ত ছাঁটাই ও বদলি আতঙ্ক বিরাজ করছে; তুচ্ছ কারণে বদলি, সাময়িক বরখাস্ত কিংবা চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ রয়েছে, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে ঘনিষ্ঠ ও অনুগতদের বসানো, বিভাগীয় দক্ষতা উপেক্ষা করে পদায়ন, মানবসম্পদ বিভাগের কর্মীকে শাখায়, প্রযুক্তি বিভাগের কর্মীকে সাধারণ ব্যাংকিংয়ে এবং অডিট বিভাগে অনভিজ্ঞদের দায়িত্ব দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

পাশাপাশি পদত্যাগকারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্রাচুইটির অর্থ পরিশোধে বিলম্ব এবং জোর করে বন্ডে স্বাক্ষর নেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর অভিযোগও রয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত দুই মাসে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার আমানত ব্যাংক থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে, ফলে তারল্য পরিস্থিতি চাপে পড়েছে; নতুন ব্যবসা অনুমোদন ও পুরনো ঋণ নবায়ন প্রস্তাব নাকচ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

যা ব্যবসায়িক স্থবিরতা বাড়াচ্ছে এবং গ্রাহকের আস্থাকে দুর্বল করছে। একদিকে ব্যয় সংকোচনের কথা বলা হলেও প্রশাসনিক ব্যয়ের কিছু খাতে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।

সাধারণ কর্মীদের পদোন্নতি ও প্রণোদনা স্থগিত থাকলেও চেয়ারম্যানের জন্য দামী গাড়ি ক্রয়, কার্যালয়ে ব্যয়বহুল সংস্কার এবং নিরাপত্তাপ্রহরী নিয়োগে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে।

আগে যেখানে গড়ে ১২ হাজার টাকা খরচ হতো, সেখানে এখন ২৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় দেখানো হচ্ছে এবং এর একটি অংশ কমিশন হিসেবে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

চেয়ারম্যান নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থেকে দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছেন—এমন অভিযোগ তুলে শেয়ারহোল্ডাররা প্রধান উপদেষ্টা, অর্থ উপদেষ্টা ও দুর্নীতি দমন কমিশন–সহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, কোনো ব্যাংকে নিয়োগ বা অন্য বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে দেখা হয় এবং সত্যতা মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পিসিএ কাঠামোর আওতায় থাকা কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি, নইলে আর্থিক স্থিতিশীলতায় চাপ তৈরি হতে পারে।

 

সব মিলিয়ে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের ওপরই এখন নির্ভর করছে এনআরবিসি ব্যাংকের প্রতি গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের আস্থা।

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর