[email protected] শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬
২০ চৈত্র ১৪৩২

পর্দার অন্তরালে রাঘববোয়ালরা, ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ এপ্রিল ২০২৬ ৫:৪৬ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারির বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকলেও বন্ধ হচ্ছে না ডিপো কেন্দ্রিক তেল চুরি। সম্প্রতি সারা দেশে সরকারি অভিযানে বিপুল

 পরিমাণ অবৈধ মজুতকৃত তেল উদ্ধার হওয়ার পর রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানি— পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের বিভিন্ন ডিপো থেকে তেল চুরির পুরনো ক্ষতটি আবারও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী সিবিএ নেতা এবং অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার লিটার তেল কালোবাজারে চলে যাচ্ছে।

​তদন্তে দেখা গেছে, সারা দেশজুড়ে তেল চোরচক্রের এক বিশাল জাল বিস্তৃত। অনেক ক্ষেত্রে চুরি যাওয়া তেলকে 'সিস্টেম লস' বা 'ট্রান্সপোর্ট লস' হিসেবে দেখিয়ে সমন্বয় করে কর্তৃপক্ষ। মাঝেমধ্যে চুরির ঘটনা ধরা পড়লেও রাঘববোয়ালরা সব সময় পর্দার অন্তরালে থেকে যায় এবং ছোট কর্মচারীদের ওপর দোষ চাপিয়ে দায় সারার চেষ্টা চলে।

​চট্টগ্রাম ও পার্বতীপুর: ২০২৪ সালে পার্বতীপুর ডিপো থেকে ৬ হাজার লিটার তেল চুরির তদন্ত হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি একই ডিপো থেকে আরও ৪৫ হাজার লিটার তেল উধাও হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অসাধু কর্মকর্তারা ডিলারদের মাধ্যমে কাগজ-কলমে বিক্রি দেখিয়ে এই চুরির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে জানা গেছে।

​নারায়ণগঞ্জ (ফতুল্লা ও গোদনাইল): গোদনাইল ডিপো থেকে কুর্মিটোলা যাওয়ার পথে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল চুরির চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ আছে, বিমানের এই জ্বালানি অকটেনের সাথে মিশিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়। এছাড়া ফাজিলপুর এলাকায় লরি থেকে তেল নামিয়ে নেওয়া এবং বুড়িগঙ্গা নদীতে জাহাজ থেকে বাল্কহেডে তেল সরানোর ঘটনাও নিত্যনৈমিত্তিক।

​খুলনা ও মোংলা: মোংলা ডিপোতে অভিযানে কাগজে-কলমে থাকা মজুতের চেয়ে ১২ হাজার লিটারের বেশি অতিরিক্ত তেল পাওয়া গেছে, যার কোনো বৈধ উৎস কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি। খুলনার গ্রামগঞ্জেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে চোরাই তেল বিক্রির সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে।

​চুরির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে অনেক সময় নিচু পদের কর্মচারীদের বদলি বা বরখাস্ত করা হলেও মূল হোতারা বহাল তবিয়তেই থাকছেন। অনেক অভিযুক্ত কর্মকর্তা তদন্তের মুখে পড়লেও পরবর্তীতে লবিংয়ের মাধ্যমে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন পাচ্ছেন। বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া এসব কর্মকর্তাদের জীবনযাত্রায় দুর্নীতির ছাপ স্পষ্ট থাকলেও আইনি জটিলতা বা প্রভাবের কারণে তারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

​জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে ডিপোগুলোর ইনপুট ও আউটপুট সরকারি সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে পেট্রোল পাম্পগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তেল চুরির এই দীর্ঘমেয়াদী শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে শুধু ছোট কর্মচারীদের শাস্তি নয়, বরং এর নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর