দীর্ঘদিনের খরা, পানির তীব্র সংকট ও অনাবাদি জমির হতাশা কাটিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র অঞ্চলে দেখা দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা।
খাল পুনঃখনন, ভরাট হয়ে যাওয়া পুকুর-জলাশয় সংস্কার এবং নদীর পানি সংরক্ষণের উদ্যোগে নাচোল ও গোমস্তাপুর উপজেলার কৃষিচিত্রে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
প্রায় দেড় দশক পর বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে আবারও বোরো ধানের সবুজে ফিরেছে প্রাণ, যা স্থানীয়দের কাছে এক ধরনের ‘কৃষি বিপ্লব’ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) বাস্তবায়িত “খালে পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সেচ সম্প্রসারণ” প্রকল্পের ফলে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর অনাবাদি জমি এখন চাষের আওতায় এসেছে।
আগে পানির অভাবে বছরের পর বছর পতিত পড়ে থাকা জমিতে এখন বোরো ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, উঁচু ও শুষ্ক ভূপ্রকৃতির কারণে এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা ছিল বেশি।
এতে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল এবং কৃষিতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল।
তবে খাল খনন ও নদীর পানি সংরক্ষণের ফলে সেই পরিস্থিতি বদলেছে। বর্তমানে নদীর পানি খাল ও জলাশয়ে ধরে রেখে সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্পের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হচ্ছে, যা ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
এখন অনেক জমিতে বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে বলে জানান কৃষকরা। এতে তাদের আয় বেড়েছে এবং জীবনযাত্রার মানেও উন্নতি এসেছে। একই সঙ্গে খাল ও জলাশয় পুনঃখননের কারণে মাছ চাষও বেড়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও পুষ্টির জোগান—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন পর এভাবে চাষাবাদ ফিরে আসায় বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এ উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ দেশের অন্যতম উৎপাদনশীল কৃষি অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. ইয়াছিন আলী বলেন, খাল খনন ও পানি সংরক্ষণের ফলে কৃষিতে যে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এটি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে, বিএমডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী আল মামুনুর রশীদ জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলের শুষ্কতা কমাতে আরও খাল খনন ও জলাশয় সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের সফলতা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে উৎসাহ দিচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কৃষকদের দাবি, অবশিষ্ট খালগুলো দ্রুত পুনঃখনন করা হলে সেচ সুবিধা আরও বাড়বে এবং কৃষি উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
জেলায় ইতোমধ্যে বৃষ্টি ও নদীর পানি সংরক্ষণের জন্য ২৭১ কিলোমিটার খাল এবং ১,০৯১টি পুকুর পুনঃখনন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে বরেন্দ্র অঞ্চল শুধু খরাপ্রবণ এলাকা হিসেবেই নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার সক্ষমতাও অর্জন করবে।
এসআর
মন্তব্য করুন: