চাঁদপুরের মতলব উত্তরে দূর্গাপুর ইউনিয়নে হরিনা গ্রামের জাকির হোসেন নামে এক কৃষকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
যাকে ‘মেয়েকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় হত্যাকাণ্ড’ বলে প্রচার করা হচ্ছিল, অনুসন্ধানে দেখা গেছে তার মূলে রয়েছে একটি মোবাইল ফোনের পাওনা টাকা এবং জমি সংক্রান্ত পুরনো শত্রুতা।
এমনকি হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জাকির হোসেনের মৃত্যু হয়েছে ‘ব্রেইন স্ট্রোকে’ যা এখন একটি মহল ‘হত্যা’ হিসেবে চালিয়ে দিয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর অপচেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার প্রকৃত সূত্রপাত জাকির হোসেনের ছোট ভাই হোসেনকে নিয়ে। হোসেন জনৈক ফাহিমের শশুরের কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন কেনেন, যার টাকা দীর্ঘ দিন ধরে পরিশোধ করছিলেন না।
গত রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে পাওনা টাকা চাইতে তার বাড়িতে গেলে হোসেন তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন এবং টাকা দেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন।
এই ঘটনার জেরে গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি)
নিশ্চিন্তপুর বাজারে ইফতারের পর পর সালাউদ্দিন এর দোকানের সামনে মেহেদী, সাফিন, পারভেজ এর সাথে হোসেনের বাগবিতণ্ডা হলে জাকির হোসেন মধ্যস্থতা করতে এলে দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে মারামারি হয় পরে স্থানীয় বাজারের উপস্থিত লোকজন তাৎক্ষণিক ভাবে বিষয়টি মীমাংসা করে দেন। সেখানে কোনো বড় ধরনের মারামারি বা জখমের ঘটনা ঘটেনি।
সেদিন রাত ৮.৩৫ মিনিটে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইমারজেন্সি বিভাগে চিকিৎসার জন্য যান জাকির হোসেন। কর্তব্যরত চিকিৎসক জাকির হোসেনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বাড়ীতে পাঠিয়ে দেন। হাসপাতালের রেজিস্ট্রারে উল্লেখ্য আছে জাকির হোসেন তার পা'য়ে সামান্য আঘাত পেয়েছে।
স্থানীয়রা বলেন, রমজান উপলক্ষে স্কুল বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ‘স্কুলে যাওয়া-আসার পথে ইভটিজিং বিষয়টি কিভাবে সম্ভব। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই তুচ্ছ পাওনা টাকার ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হোসেন তার ভাতিজি (জাকিরের মেয়েকে) ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে থানায় একটি ইভটিজিং এর মামলা দায়ের করেন।
এই ইভটিজিংয়ের বিষয়ে নিশ্চিন্তপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: আরিফ উল্লাহ বলেন, ইভটিজিং সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ তার কাছে আসেনি। তাছাড়া, রমজান মাসে স্কুল বন্ধ থাকায় সেখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটার কোনো সুযোগ নেই।
এখন জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, স্কুল বন্ধের মধ্যে ইভটিজিংয়ের নাটক সাজানো হলো কার ইশারায়?
পারিবারিক ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, কথিত ঝামেলার ৪-৫ দিন পর জাকির হোসেন নিশ্চিন্তপুর পূর্ব বাজার জমিরের দোকান থেকে এক বস্তা সার কিনে নিজেই মাথায় করে বাড়ি নিয়ে যান। বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকেই তিনি ঘাড় ও মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন।
স্বজনরা তাকে দ্রুত মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিযে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, অতিরিক্ত পরিশ্রম বা চাপের কারণে তিনি ‘ব্রেইন স্ট্রোক’ করেছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন কিন্তু পরিবার তাকে কুমিল্লার কুচাইতলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান তিনি ‘ব্রেইন স্ট্রোক’ করেছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে রেফার্ড করে দেন।
সেখান থেকে মঙ্গলবার (৩ মার্চ) উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়। মেডিকেল রিপোর্ট অনুযায়ীও মৃত্যুর কারণ ‘ব্রেইন স্ট্রোক’।
এলাকাবাসীর দাবি, জাকির হোসেনের স্বাভাবিক মৃত্যুকে পুঁজি করে একটি কুচক্রী মহল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার চেষ্টা করছে। নিশ্চিন্তপুর স্কুলের জমি সংক্রান্ত পুরনো বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘ইভটিজিং ও হত্যা’র মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, এটি মূলত ‘লাশ নিয়ে ব্যবসা’র একটি জঘন্য প্রচেষ্টা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে করা দুটি মামলার তথ্যে বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে। প্রথম মামলায় অভিযুক্ত ছয় জনের মধ্যে যে প্রধান আসামি ছিল, দ্বিতীয় মামলায় (হত্যা মামলা) তাকেই ১১ নম্বর আসামি করা হয়েছে। এই অসামঞ্জস্যতা মামলার স্বচ্ছতা ও অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
কৃষক জাকির হোসেনকে কেন্দ্র করে মতলব উত্তর থানায় যে হত্যা মামলা করা হয়েছে সেখানেও দেখা গেছে অসংগতি এ মামলা আমেরিকান প্রবাসী মৃত্যু আব্দুর রব বেপারীর ছেলে মতলব উত্তর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মনছুর আলম ইমনসহ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী'কে আসামি করা হয়েছে। হত্যা মামলায় ইভটিজিং এর কথা উল্লেখ্য করা হয়েছে সেখানে আসামি করা হয়েছে আয়নুল কবির ফটিক (৫৫) ও ছেলে সাফিন শিকদার (২৩) কে। এ ঘটনায় জনমনে প্রশ্ন বাবা আর ছেলে কিভাবে স্কুল পড়ুয়া মেয়েকে ইভটিজিং করে। এবং আমেরিকান প্রবাসী প্রবাসে থেকে ও ঢাকায় ব্যবসা ও চাকুরী করে তারা কিভাবে হত্যা কান্ডও ইভটিজিং এ অংশ গ্রহন করে।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে নিরীহ ছাত্র, প্রবাসী ও ব্যবসায়ী'দের হয়রানি বন্ধ করা হোক এবং যারা মিথ্যা মামলা ও প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।
“মামলার বাদী জসিম মিয়াজী বলেন, আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। যেন ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হতে না হয়।”
এ বিষয়ে মতলব উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, নিহত জাকিরের বড় ভাই জসিম মিয়াজী বাদী হয়ে মতলব উত্তর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। দ্রুতই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা হবে এবং প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
এসআর
মন্তব্য করুন: